জুলাই গণঅভ্যুত্থান আইন ২০২৬ পাস: অংশগ্রহণকারীদের সুরক্ষা ও মামলা প্রত্যাহারের বিধান
৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ৩:৪৬ অপরাহ্ণ
অন্তর্বর্তী সরকারের হাতে আর মাত্র তিন কর্মদিবস বাকি থাকতেই ১ হাজার ৭১৯টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত করার তৎপরতা শুরু হয়েছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় এসব প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত করতে অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাছে ৬৭০ কোটি টাকা বরাদ্দ চেয়েছে। এত স্বল্প সময়ে বড় পরিসরের এই উদ্যোগকে ঘিরে শিক্ষা প্রশাসনে ব্যাপক আলোচনা ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গত ৩ ফেব্রুয়ারি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ নিম্ন মাধ্যমিক থেকে স্নাতকোত্তর পর্যন্ত সাতটি স্তরের ১ হাজার ৭১৯টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য অর্থ বিভাগের কাছে বরাদ্দ চায়। এর মধ্যে চলতি অর্থবছরের শেষ তিন মাসের জন্য প্রয়োজন হবে প্রায় ১৬৭ কোটি টাকা, যা সংশোধিত বাজেটের উপযোজনের মাধ্যমে সংস্থান করার পরিকল্পনা রয়েছে।
‘বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান (স্কুল ও কলেজ) জনবল কাঠামো ও এমপিও নীতিমালা-২০২৫’ অনুযায়ী গত ১৪ জানুয়ারি থেকে ২৫ জানুয়ারি পর্যন্ত অনলাইনে নতুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তির আবেদন নেওয়া হয়। এ সময়ে মোট ৩ হাজার ৬১৫টি আবেদন জমা পড়ে। যাচাই-বাছাই শেষে ১ হাজার ৭৩৬টি প্রতিষ্ঠানকে প্রাথমিকভাবে যোগ্য হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এর মধ্য থেকে ১ হাজার ৭১৯টি প্রতিষ্ঠানকে এমপিওভুক্ত করার জন্য অর্থ বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে।
যোগ্য হিসেবে নির্বাচিত প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে—নিম্ন মাধ্যমিক স্তরে ৪৭১টি, মাধ্যমিকে ৬২৩টি, উচ্চ মাধ্যমিক (স্কুল অ্যান্ড কলেজ) ১৩৫টি, উচ্চ মাধ্যমিক (কলেজ) ১৪৫টি, ডিগ্রি পর্যায়ে ৭৮টি এবং স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ে ২৭৭টি প্রতিষ্ঠান। স্নাতক (অনার্স) ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ের এসব ২৭৭টি প্রতিষ্ঠানের জন্যই ১২৫ কোটি টাকা বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে। এই স্তরটিকে ঘিরেই মূলত বড় ধরনের আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে।
অভিযোগ রয়েছে, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একজন প্রভাবশালী অতিরিক্ত সচিব, একজন উপসচিব এবং উপদেষ্টা ও সচিবের দপ্তরের দুই কর্মকর্তা এই প্রক্রিয়ার নেপথ্যে থেকে অনৈতিক সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করছেন। এমপিওভুক্তির পুরো প্রক্রিয়াটি অস্বাভাবিক দ্রুতগতিতে সম্পন্ন করা হচ্ছে, যা নিয়ে খোদ শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ভেতরেও প্রশ্ন উঠেছে।
এ ছাড়া নিম্ন মাধ্যমিক পর্যায়ে ৪৭১টি প্রতিষ্ঠানের জন্য ১৮৩ কোটি টাকা, মাধ্যমিকে ৬২৩টির জন্য ৯২ কোটি টাকা, উচ্চ মাধ্যমিক (বিদ্যালয়) ১৩৫টির জন্য ১০২ কোটি টাকা, উচ্চ মাধ্যমিক (কলেজ) ১৪৫টির জন্য ১২৭ কোটি টাকা এবং ডিগ্রি স্তরের ৭৮টি প্রতিষ্ঠানের জন্য ৩৯ কোটি টাকা বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, শেষ সময়ে এমপিওভুক্তির ‘বাণিজ্য’ সহজ করতে এমপিও নীতিমালায় সংশোধন আনা হয়েছে। নীতিমালা অনুযায়ী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের একাডেমিক স্বীকৃতি, শিক্ষার্থী সংখ্যা ও পাসের হারের ভিত্তিতে পয়েন্ট দেওয়ার কথা থাকলেও অনেক ক্ষেত্রে অযোগ্য প্রতিষ্ঠানকেও তালিকাভুক্ত করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একজন অতিরিক্ত সচিব কালবেলাকে বলেন, ‘অর্থ মন্ত্রণালয়ের সবুজ সংকেত পেলেই চূড়ান্ত ঘোষণা আসবে। তবে এই এমপিওভুক্তি শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়ন হবে কি না, তা পুরোপুরি নির্ভর করছে অর্থ মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তের ওপর। কারণ অর্থ ছাড় না হলে এই সিদ্ধান্ত কার্যকর করা সম্ভব নয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘এমপিওভুক্তির মতো বড় আর্থিক সিদ্ধান্ত দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও স্বচ্ছতার মাধ্যমে নেওয়া উচিত। সরকারের বিদায়লগ্নে এমন তড়িঘড়ি উদ্যোগ দুর্নীতির সুযোগ তৈরি করতে পারে।’
এ বিষয়ে জানতে শিক্ষা উপদেষ্টা ড. সি আর আবরারের সঙ্গে একাধিকবার মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। পরে তার ব্যক্তিগত কর্মকর্তা (পিএস) তাজকির-উজ-জামানের হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে বার্তা পাঠানো হলেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
নন-এমপিও শিক্ষক-কর্মচারী ঐক্যজোটের সভাপতি সেলিম মিয়া বলেন, ‘আমাদের দীর্ঘ আন্দোলনের ফলেই সরকার এমপিওভুক্তির সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আমরা চাই সব যোগ্য প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত হোক এবং নির্বাচনের আগেই অন্তত এমপিও কোড দেওয়া হোক। তবে এই প্রক্রিয়ায় যদি আর্থিক অনিয়ম হয়ে থাকে, সেটি অবশ্যই খতিয়ে দেখা উচিত।’
২০২৫ সালের এমপিও নীতিমালা অনুযায়ী, একটি নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয় এমপিওভুক্ত করতে বছরে প্রায় ৩৯ লাখ টাকা, মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের জন্য ৫৩ লাখ টাকা, উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয় উন্নীত করতে অতিরিক্ত ৭৫ লাখ টাকা এবং একটি উচ্চ মাধ্যমিক কলেজ এমপিওভুক্ত করতে বছরে প্রায় ৮৭ লাখ টাকা ব্যয় হয়। ডিগ্রি কলেজ পর্যায়ে উন্নীত করতে বার্ষিক ব্যয় প্রায় ৫০ লাখ টাকা। সীমিত বাজেটের মধ্যে একসঙ্গে বিপুলসংখ্যক প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত করা আর্থিকভাবে অত্যন্ত কঠিন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সর্বশেষ ২০২১ সালে ২ হাজার ৭০০-এর বেশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত করা হয়। এরপর রাজনৈতিক বিবেচনায় নীতিমালার বাইরে আরও ৭১টি প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত হলে সমালোচনা সৃষ্টি হয়। তার পর থেকে নতুন করে এমপিওভুক্তি কার্যক্রম বন্ধ ছিল। গত বছর শুধু নন-এমপিও শিক্ষকরা এমপিওভুক্তির দাবিতে মোট ৮৭ দিন আন্দোলন করেন।