পহেলা বৈশাখ জাতিসত্তা ও সংস্কৃতির অনন্য প্রতীক: প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান
১৪ এপ্রিল ২০২৬, ৯:৪৫ পূর্বাহ্ণ
অন্ধকার সরিয়ে ভোরের আলো যখন ধীরে ধীরে রাজধানীর আকাশে ছড়িয়ে পড়ছিল, তখনই রমনার বটমূল প্রাঙ্গণে জমতে শুরু করে মানুষের ঢল। লাল-সাদা শাড়ি ও পাঞ্জাবিতে সজ্জিত নানা বয়সী মানুষের উপস্থিতিতে তৈরি হয় এক প্রাণবন্ত সাংস্কৃতিক সমাবেশ। নতুন বছরকে বরণ করার মধ্য দিয়ে এখানে যেন উচ্চারিত হয় বাঙালির আত্মপরিচয়।
এই আয়োজনের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল ছায়ানট, যারা ১৯৬৭ সাল থেকে পহেলা বৈশাখে প্রভাতি অনুষ্ঠানের মাধ্যমে বাঙালির সাংস্কৃতিক চেতনাকে লালন করে আসছে। এবারের প্রতিপাদ্য ছিল- ‘চিত্ত যেথা ভয়শূন্য, উচ্চ যেথা শির’, যা মানবমুক্তির চেতনায় অনুপ্রাণিত।
সকাল সোয়া ৬টায় সম্মেলক কণ্ঠে ‘জাগো আলোক-লগনে’ গানের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানের সূচনা হয়। এরপর ধারাবাহিকভাবে পরিবেশিত হয় রবীন্দ্রসংগীত, নজরুল সংগীত, দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের গান এবং লালন সাঁইয়ের দর্শনভিত্তিক সংগীত।
মাকছুরা আখতার অন্তরা, আজিজুর রহমান তুহিন, সেমন্তী মঞ্জরী, তানিয়া মান্নান ও লাইসা আহমদ লিসার কণ্ঠে রবীন্দ্রসংগীত মুগ্ধতা ছড়ায়। অন্যদিকে বিটু কুমার শীল, বিজন চন্দ্র মিস্ত্রী, নাসিমা শাহীন ফ্যান্সি, খায়রুল আনাম শাকিল ও শারমিন সাথী ইসলাম ময়নার কণ্ঠে নজরুল সংগীত এনে দেয় দ্রোহ ও সাম্যের শক্তি।
দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের গান পরিবেশন করেন শ্রাবন্তী ধর এবং লালনের ‘বড় সংকটে পড়িয়া দয়াল’ গানটি গেয়ে শোনান চন্দনা মজুমদার। লোকগান, পল্লীগীতি ও সম্মেলক পরিবেশনায় ‘ভয় হতে তব অভয় মাঝে’, ‘পথে এবার নামো সাথী’, ‘এসো মুক্ত করো’, ‘সেদিন আর কত দূরে’- এসব গানে উঠে আসে সামাজিক দায়বদ্ধতা ও মুক্তচিন্তার আহ্বান। পাশাপাশি আবৃত্তিতে উঠে আসে বিভিন্ন কবির ভাবনা। সলিল চৌধুরীর ‘এক গুচ্ছ চাবি’ আবৃত্তি করেন খায়রুল আলম সবুজ।
প্রায় ২০০ শিল্পীর অংশগ্রহণে এই আয়োজন সকালজুড়ে সংগীত, কবিতা ও সংস্কৃতির এক অনন্য মেলবন্ধন সৃষ্টি করে। শিশু থেকে প্রবীণ সবাই মিলে এখানে গড়ে ওঠে এক আত্মিক বন্ধন, যেখানে প্রজন্মের ব্যবধান মুছে গিয়ে তৈরি হয় সাংস্কৃতিক ঐক্য।
অনুষ্ঠানের সমাপ্তি ঘটে জাতীয় সংগীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে। তবে এর চূড়ান্ত তাৎপর্য ফুটে ওঠে ছায়ানটের সভাপতি সারওয়ার আলীর বক্তব্যে। তিনি সময়ের অস্থিরতা, সহিংসতা এবং সাংস্কৃতিক চর্চার ওপর ক্রমবর্ধমান হুমকির বিষয় তুলে ধরেন। তিনি বলেন, পহেলা বৈশাখ শুধু উৎসব নয়- এটি বাঙালির জাতিসত্তার প্রতিফলন। অতীতের সহিংস ঘটনার প্রসঙ্গ টেনে তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, সংস্কৃতির ওপর আঘাত নতুন নয়; রমনার বটমূলেও ঘটেছে ভয়াবহ হামলা, যার স্মৃতি এখনও বেদনাদায়ক।
সারওয়ার আলীর বক্তব্যে উঠে আসে উদ্বেগ সমাজে অসহিষ্ণুতা বাড়ছে, মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় তৈরি হচ্ছে ভয়। একইসঙ্গে তিনি বিশ্বশান্তির প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন। শেষ পর্যন্ত তার কণ্ঠে ধ্বনিত হয় এক গভীর আকাঙ্ক্ষা- একটি সমাজ, যেখানে মানুষ নির্ভয়ে কথা বলতে পারবে, গান গাইতে পারবে এবং স্বাধীনভাবে সংস্কৃতির চর্চা করতে পারবে। যেখানে প্রতিষ্ঠিত হবে সেই চেতনা - ‘চিত্ত যেথা ভয়শূন্য, উচ্চ যেথা শির, জ্ঞান যেথা মুক্ত।’