মঙ্গলবার, ১৪ এপ্রিল, ২০২৬

চাকরিকেন্দ্রিক শিক্ষা সৃজনশীলতাকে দাসে পরিণত করছে: ইউনূস


যুবসমাজের প্রত্যাশা ও আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে যুগোপযোগী করার পাশাপাশি আঞ্চলিক উচ্চশিক্ষায় সহযোগিতা বাড়াতে সার্ককে পুনরুজ্জীবিত করার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস। তিনি বলেন, চাকরিকেন্দ্রিক শিক্ষা নয়, বরং সৃজনশীল ও উদ্যোক্তা তৈরিই হওয়া উচিত শিক্ষাব্যবস্থার মূল লক্ষ্য।

১৩ জানুয়ারী ২০২৬, ৯:২৪ অপরাহ্ণ 

চাকরিকেন্দ্রিক শিক্ষা সৃজনশীলতাকে দাসে পরিণত করছে: ইউনূস
  গুগল নিউজে ফলো করে আজকের প্রসঙ্গ এর সাথে থাকুন

যুবসমাজের প্রত্যাশা ও আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস। একই সঙ্গে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে উচ্চশিক্ষায় সহযোগিতা বাড়াতে আঞ্চলিক জোট সার্ককে পুনরুজ্জীবিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।

মঙ্গলবার (১৩ জানুয়ারি) সকালে রাজধানীর একটি হোটেলে তিন দিনব্যাপী ‘দক্ষিণ এশিয়ার উচ্চশিক্ষার বর্তমান অবস্থা ও ভবিষ্যৎ পথনির্দেশনা’ শীর্ষক আঞ্চলিক সম্মেলন (সার্চে-২০২৬)-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন অধ্যাপক ইউনূস।

প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ঢাকায় উচ্চপর্যায়ের শিক্ষাবিদদের একত্র হওয়া অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। বিশেষ করে ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর গত কয়েক মাসে ঢাকায় ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো পর্যালোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ তৈরি করেছে এই সম্মেলন। এসব ঘটনা বিশ্লেষণ করলে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা ও সামগ্রিকভাবে শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য আরও স্পষ্ট হবে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) তত্ত্বাবধানে বাংলাদেশ সরকার ও বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে বাস্তবায়িত হায়ার এডুকেশন অ্যাকসেলারেশন অ্যান্ড ট্রান্সফরমেশন (হিট) প্রকল্পের আওতায় সম্মেলনটির আয়োজন করা হয়। এতে যুক্তরাজ্য, মালদ্বীপ, মালয়েশিয়া, নেপাল, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কাসহ বিভিন্ন দেশের ৩০ জন আন্তর্জাতিক প্রতিনিধি এবং বিশ্বব্যাংকের প্রতিনিধিরা অংশ নিচ্ছেন।

২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে শিক্ষার্থীদের ভূমিকার কথা তুলে ধরে অধ্যাপক ইউনূস বলেন, তরুণদের নিজস্ব চিন্তা ও মনন রয়েছে। তারা ফ্যাসিবাদী শাসনের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে জীবন দিয়ে প্রতিবাদ করেছে। তিনি বলেন, কয়েক মাস আগেই এই শহরে তরুণরা কেন অস্ত্রের মুখে দাঁড়িয়ে নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেছিল- তাদের সেই প্রত্যাশা ও আকাঙ্ক্ষা বোঝার চেষ্টা না করলে একটি বড় সুযোগ নষ্ট হবে। শিক্ষার্থীদের প্রেরণার উদাহরণ হিসেবে তিনি শহীদ স্কুলছাত্র শাহরিয়ার খান আনাসের মায়ের কাছে লেখা একটি চিঠির কথা উল্লেখ করেন, যেখানে বন্ধুদের সঙ্গে রাজপথে নামাকে নিজের দায়িত্ব হিসেবে উল্লেখ করেছিল সে।

অধ্যাপক ইউনূস বলেন, এসব ঘটনা হঠাৎ কোনো বিস্ফোরণ নয়। শ্রীলঙ্কা ও নেপালেও অনুরূপ ঘটনা ঘটেছে, তবে ঢাকায় তা আরও ব্যাপক আকারে প্রকাশ পেয়েছে। সম্মেলন আয়োজনের জন্য বিশ্বব্যাংককে ধন্যবাদ জানিয়ে তিনি বলেন, আঞ্চলিক সহযোগিতার এমন উদ্যোগ সার্কের দায়িত্বের মধ্যেই পড়ে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে সার্ককে আজ প্রায় ভুলে যাওয়া হয়েছে। সার্কের মূল দর্শন ছিল পারস্পরিক বিনিময় ও একে অন্যের কাছ থেকে শেখা। প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই তিনি সার্ক পুনরুজ্জীবনের আহ্বান জানিয়ে আসছেন এবং ভবিষ্যতেও এই দাবি অব্যাহত রাখবেন।

আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচন ও গণভোটের প্রসঙ্গ টেনে অধ্যাপক ইউনূস বলেন, গণঅভ্যুত্থান দেশের পুরোনো কাঠামোকে ভেঙে দিয়েছে। তরুণরা নিজেদের জুলাই সনদ তৈরি করেছে এবং তারা মনে করে, দেশের সমস্যার মূল নিহিত রয়েছে সংবিধানে। এ কারণেই ভবিষ্যৎ সংবিধান নির্ধারণে গণভোটের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, এসব বিষয় শ্রেণিকক্ষে আলোচিত হয় না। অথচ তরুণরা ইতোমধ্যে নিজেদের রাজনৈতিক দল গঠন করেছে; ভবিষ্যতে তাদের কেউ কেউ সংসদ সদস্য বা এমনকি শিক্ষামন্ত্রীর দায়িত্বও নিতে পারে।

প্রধান উপদেষ্টা আরও বলেন, বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থা মৌলিকভাবে চাকরিকেন্দ্রিক, যা একটি ভুল ধারণার ওপর দাঁড়িয়ে আছে। শিক্ষার উদ্দেশ্য কেবল চাকরির জন্য মানুষ তৈরি করা- এই ভাবনা থেকে বেরিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি। তাঁর মতে, মানুষ জন্মগতভাবেই সৃজনশীল এবং সেই সৃজনশীলতাই মানবসভ্যতার মূল শক্তি। চাকরিনির্ভর শিক্ষা ব্যবস্থায় সৃজনশীল মানুষ দাসে পরিণত হচ্ছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

তিনি বলেন, শিক্ষাব্যবস্থার লক্ষ্য হওয়া উচিত তরুণদের উদ্যোক্তা ও পরিবর্তনের কারিগর হিসেবে গড়ে তোলা, চাকরিপ্রার্থী হিসেবে নয়। কল্পনাশক্তিই মানুষের সবচেয়ে বড় শক্তি, আর সেই শক্তির জোরেই তরুণরা নতুন বাংলাদেশের স্বপ্নে জীবন দিয়েছে।

অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন শিক্ষা উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. সি আর আবরার। ইউজিসি চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. এস এম এ ফায়েজের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে সম্মানিত অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব রেহানা পারভীন এবং বিশ্বব্যাংকের ডিভিশন ডিরেক্টর জ্যঁ পেসমে। স্বাগত বক্তব্য দেন ইউজিসি সদস্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ তানজিমউদ্দিন খান।