শনিবার, ১৭ অক্টোবর, ২০২৬
ফুটবলের ইতিহাস •

বাইরে ফুটবল, ভেতরে অন্য আবেগ! বিশ্বকাপের সেই ম্যাচ নিয়ে মুখ খুললেন লাউতারো


ইংল্যান্ডের বিপক্ষে আর্জেন্টিনার জয়ের পেছনে ফুটবলীয় লড়াইয়ের পাশাপাশি ফকল্যান্ড যুদ্ধের ইতিহাসও প্রভাব ফেলেছিল বলে জানিয়েছেন লাউতারো মার্তিনেজ। নিজের গুরুত্বপূর্ণ গোলটি তিনি উৎসর্গ করেন যুদ্ধে অংশ নেওয়া আর্জেন্টাইন সেনাদের। তাঁর মতে, দেশের ইতিহাস ও সমর্থকদের আবেগ দলকে বাড়তি প্রেরণা জুগিয়েছিল।

১৭ অক্টোবর ২০২৬, ১১:১৬ পূর্বাহ্ণ 

বাইরে ফুটবল, ভেতরে অন্য আবেগ! বিশ্বকাপের সেই ম্যাচ নিয়ে মুখ খুললেন লাউতারো
  গুগল নিউজে ফলো করে আজকের প্রসঙ্গ এর সাথে থাকুন

ইংল্যান্ডের বিপক্ষে আর্জেন্টিনার জয়কে ঘিরে মাঠের লড়াইয়ের বাইরেও কাজ করেছিল ইতিহাস, জাতীয় আবেগ ও ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জের পুরোনো বিরোধ। বাইরে থেকে ম্যাচটিকে সাধারণ ফুটবল লড়াই হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করা হলেও দলের ভেতরে এর গুরুত্ব ছিল আরও গভীর। সম্প্রতি সেই অভিজ্ঞতার কথাই তুলে ধরেছেন আর্জেন্টাইন স্ট্রাইকার লাউতারো মার্তিনেজ।

ইন্টার মিলানের এই ফরোয়ার্ডের দাবি, ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচটি অন্য সব ম্যাচের মতো ছিল না। দুই দেশের দীর্ঘদিনের ঐতিহাসিক বিরোধ খেলোয়াড়দের মনে বাড়তি আবেগ ও লড়াইয়ের প্রেরণা তৈরি করেছিল। তবে সেই অনুভূতি প্রকাশ্যে তুলে ধরার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকতে হয়েছিল দলকে।

আর্জেন্টিনার ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে লাউতারো নিজের গোলের পেছনের আবেগের কথা বলেন। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে গুরুত্বপূর্ণ গোলটি তিনি উৎসর্গ করেছিলেন ১৯৮২ সালের ফকল্যান্ড যুদ্ধে অংশ নেওয়া আর্জেন্টাইন সেনাদের। পরে নিজের গোল উদ্‌যাপনের দৃশ্য দেখে এক যুদ্ধফেরত সেনার আবেগাপ্লুত হওয়ার ভিডিও দেখানো হলে তিনিও আবেগ ধরে রাখতে পারেননি।

লাউতারোর ভাষ্য, দেশের জন্য লড়াই করা সেই সেনারাই তাঁদের প্রতিকূলতার মুখে দাঁড়িয়ে লড়াই করার শিক্ষা দিয়েছেন। তাঁদের আত্মত্যাগের প্রতি সম্মান জানাতেই গোলটি উৎসর্গ করেছিলেন তিনি। তাঁর মতে, জাতীয় দলের সাফল্যের সঙ্গে সাবেক সেনাদের আত্মত্যাগের স্মৃতি জড়িয়ে থাকা বিশেষ তাৎপর্য বহন করে।

ম্যাচটির আগে আর্জেন্টিনার কোচ লিওনেল স্কালোনি চেয়েছিলেন, রাজনৈতিক বিরোধ কিংবা যুদ্ধের ইতিহাসের পরিবর্তে ফুটবলীয় লড়াইয়ের দিকেই সবার মনোযোগ থাকুক। কিন্তু খেলোয়াড়দের মনে যে বিষয়টি বাড়তি প্রভাব ফেলেছিল, লাউতারোর বক্তব্যে তা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

তিনি জানান, ক্যামেরার সামনে তাঁরা ম্যাচটিকে স্বাভাবিক ফুটবল প্রতিযোগিতা হিসেবেই উপস্থাপন করেছেন। কিন্তু দলের অভ্যন্তরে ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটের কারণে লড়াইটি ছিল আলাদা অনুভূতির। ফকল্যান্ড ইস্যু তাঁদের বাড়তি উদ্দীপনা জুগিয়েছিল বলেও মনে করেন এই আর্জেন্টাইন তারকা।

১৯৮২ সালে ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে আর্জেন্টিনা ও যুক্তরাজ্যের মধ্যে ৭৪ দিনব্যাপী যুদ্ধ হয়েছিল। আর্জেন্টিনায় দ্বীপপুঞ্জটি "ইসলাস মালভিনাস" নামে পরিচিত। ওই যুদ্ধে দুই দেশের বহু সেনা প্রাণ হারান। যুদ্ধ শেষ হলেও দ্বীপগুলোর মালিকানা নিয়ে বিরোধের অবসান হয়নি।

ইংল্যান্ডকে হারানোর পরও সেই বিতর্কের ছাপ দেখা যায় আর্জেন্টিনার উদ্‌যাপনে। দলের দুই খেলোয়াড় লিসান্দ্রো মার্তিনেজ ও জিওভানি লো চেলসো গ্যালারির সামনে "লাস মালভিনাস সন আর্হেন্তিনাস" লেখা একটি ব্যানার তুলে ধরেন। এর বাংলা অর্থ, "ফকল্যান্ড আর্জেন্টিনার"। ঘটনাটি নিয়ে ফিফা তদন্ত শুরু করে, কারণ স্টেডিয়ামে রাজনৈতিক বার্তা প্রদর্শনের বিষয়টি সংস্থাটির বিধিবিধানের আওতায় পড়তে পারে।

নিজের গোলের প্রকৃত তাৎপর্য অবশ্য তাৎক্ষণিকভাবে পুরোপুরি উপলব্ধি করতে পারেননি লাউতারো। বিশ্বকাপের উত্তেজনা এবং ফাইনালের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত থাকায় তখন মুহূর্তটির আবেগ তাঁর কাছে পুরোপুরি ধরা দেয়নি। দেশে ফেরার পর সমর্থকদের প্রতিক্রিয়া এবং তাঁদের কৃতজ্ঞতা প্রকাশের মধ্য দিয়ে গোলটির গভীর অর্থ বুঝতে পারেন তিনি।

লাউতারো বলেন, এই গোল তাঁর জীবনের অন্যতম স্মরণীয় ঘটনা হয়ে থাকবে। দেশের মানুষের কাছ থেকে পাওয়া ভালোবাসা তাঁকে বুঝিয়েছে, গোলটি শুধু একটি ম্যাচ জেতানোর মুহূর্ত ছিল না, এর সঙ্গে জড়িয়ে ছিল অনেক মানুষের আবেগ ও স্মৃতি।

তবে ইংল্যান্ডকে হারিয়ে ফাইনালে উঠলেও শেষ পর্যন্ত শিরোপা জেতা হয়নি আর্জেন্টিনার। ফাইনালে স্পেনের কাছে ১-০ গোলে হেরে রানার্সআপ হয় দলটি। ম্যাচের পর আর্জেন্টিনার পারফরম্যান্স নিয়ে ওঠা সমালোচনায় বিরক্তি প্রকাশ করেন লাউতারো। তাঁর মতে, দল শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত লড়াই করেছে এবং শিরোপা জয়ের জন্য নিজেদের সর্বোচ্চটা দিয়েছে।

এই স্ট্রাইকারের দাবি, ইংল্যান্ডের বিপক্ষে কঠিন লড়াইয়ের পর খেলোয়াড়েরা শারীরিক ও মানসিকভাবে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন। তবু ফাইনালে কেউ হাল ছাড়েননি। কয়েকজনের স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করাও কঠিন হয়ে পড়েছিল, কিন্তু দলের সবাই শেষ পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে গেছেন।

লাউতারোর মতে, প্রতিপক্ষ শক্তিশালী হওয়ায় ফাইনালে জয় পাওয়া কঠিন ছিল। কিন্তু আর্জেন্টিনা নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছে এ বিশ্বাসই তাঁদের স্বস্তি দেয়।

ইংল্যান্ডের বিপক্ষে জয়ের স্মৃতি ধরে রাখতে আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন ১৫ জুলাইকে জাতীয় ফুটবল দিবস হিসেবে ঘোষণা করেছে। ম্যাচটি ১৯৮৬ বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে আর্জেন্টিনার ঐতিহাসিক জয়ের স্মৃতিও ফিরিয়ে আনে। দিয়েগো মারাদোনার বিখ্যাত "হ্যান্ড অব গড" গোল এবং অসাধারণ একক প্রচেষ্টায় করা গোলটি আজও ফুটবল ইতিহাসের আলোচিত অধ্যায়।

পুরো বিশ্বকাপের অভিজ্ঞতা নিয়ে লাউতারো জানান, প্রতিটি ম্যাচেই দলকে কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি হতে হয়েছে। টুর্নামেন্টজুড়ে সমর্থকদের সঙ্গে খেলোয়াড়দের গভীর সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল। তাঁর বিশ্বাস, আর্জেন্টিনার সবচেয়ে বড় শক্তি হলো কখনো হাল না ছাড়া এবং প্রতিনিয়ত আরও ভালো করার চেষ্টা। অধিনায়ক লিওনেল মেসিও তাঁদের প্রতিকূলতার মুখে লড়াই চালিয়ে যাওয়ার অনুপ্রেরণা জুগিয়েছেন।

ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সেই জয় তাই লাউতারোর কাছে কেবল ফাইনালে ওঠার স্মৃতি নয়। এর সঙ্গে মিশে আছে দেশের ইতিহাস, যুদ্ধের স্মৃতি, সমর্থকদের আবেগ এবং জাতীয় দলের হয়ে লড়াই করার বিশেষ এক অনুভূতি।