শুক্রবার, ২৯ মে, ২০২৬

সাইপ্রাসে এস আলমের সম্পত্তি জব্দ: ৮০০ কোটি ইউরো পাচারের অভিযোগে আদালতের নির্দেশ


ব্যাংক জালিয়াতি ও অর্থপাচারের অভিযোগে চলমান ফৌজদারি তদন্তের অংশ হিসেবে এস আলম গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান মোহাম্মদ সাইফুল আলম এবং তার স্ত্রীর মালিকানাধীন একটি সম্পত্তি জব্দ করেছে সাইপ্রাস কর্তৃপক্ষ। বাংলাদেশ সরকারের আইনি অনুরোধে সাইপ্রাসের নিকোসিয়া জেলা আদালত ১৯ মে এই ক্রোকের আদেশ জারি করেন। এছাড়া, এই আদেশের একদিন পরই বাংলাদেশে অপর একটি ঋণ জালিয়াতি মামলায় সাইফুল আলমসহ তার ১১ জন সহযোগীকে ৫ মাসের কারাদণ্ড দিয়েছেন দেশের আদালত। তবে সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করে এই পদক্ষেপকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত দাবি করেছেন সাইফুল আলম।
সাইপ্রাসে এস আলমের সম্পত্তি জব্দ: ৮০০ কোটি ইউরো পাচারের অভিযোগে আদালতের নির্দেশ
  গুগল নিউজে ফলো করে আজকের প্রসঙ্গ এর সাথে থাকুন

ব্যাংক জালিয়াতি এবং অর্থপাচারের অভিযোগে চলমান একটি ফৌজদারি তদন্তের অংশ হিসেবে বাংলাদেশের বিতর্কিত ব্যবসায়ী ও এস আলম গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান মোহাম্মদ সাইফুল আলম এবং তার স্ত্রীর মালিকানাধীন সাইপ্রাসের একটি সম্পত্তি জব্দ করেছে দেশটির কর্তৃপক্ষ। প্রায় ৮০০ কোটি ইউরো (৮ বিলিয়ন ইউরো) বিদেশে পাচারের তদন্ত প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে সাইপ্রাসের নিকোসিয়া জেলা আদালত এই আদেশ জারি করেন।

স্থানীয় গণমাধ্যম ‘সাইপ্রাস মেইল’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, দুই দেশের পারস্পরিক আইনি সহযোগিতা প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বাংলাদেশ সরকারের পাঠানো অনুরোধের ভিত্তিতে সাইপ্রাসের মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ ইউনিট (মোকাস) আদালতে আবেদন করে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৯ মে সম্পত্তি জব্দের এই নির্দেশ দেওয়া হয়। আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী, সাইপ্রাসের পারেক্লিশা এলাকায় অবস্থিত সাইফুল আলমের একটি দোতলা আবাসিক ভবন ক্রোক করা হয়েছে।

বাংলাদেশি তদন্তকারীদের সাইপ্রাস কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দেওয়া নথিপত্র অনুসারে, ২০০৯ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে পরিচালিত একটি কোম্পানির নেটওয়ার্ক ও তাদের আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ খতিয়ে দেখছে বাংলাদেশ। এই তদন্তের মূল বিষয়বস্তুর মধ্যে রয়েছে জালিয়াতির মাধ্যমে ঋণ নেওয়া, অবৈধ সম্পদ অর্জন ও মানি লন্ডারিং। গোয়েন্দারা ২০১৬ সালে সাইপ্রাসে নিবন্ধিত সাইফুল আলমের মালিকানাধীন কোম্পানি ‌‘এসিএলএআরই ইন্টারন্যাশনাল’ এবং সাইপ্রাস, ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ডস ও জার্সিতে থাকা বিভিন্ন ট্রাস্ট ও কোম্পানির জটিল নেটওয়ার্ক পরীক্ষা করে দেখছেন।

সম্প্রতি বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর জানিয়েছেন, এই প্রক্রিয়ায় দেশ থেকে প্রায় ৮০০ কোটি ইউরোরও বেশি অর্থ পাচার করা হয়েছে। বাংলাদেশি কর্তৃপক্ষের ধারণা, এই পাচার করা অর্থের একটি অংশ সাইপ্রাস, সিঙ্গাপুর ও অন্যান্য দেশের সম্পত্তিতে বিনিয়োগ করা হয়েছে। তদন্তকারীরা খতিয়ে দেখছেন যে, সাইফুল আলমের সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন কোম্পানি ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ এবং ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকসহ দেশের বেশ কয়েকটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে যে বিপুল পরিমাণ ঋণ নিয়েছে (যার বড় অংশ খেলাপি), তা বিদেশে পাচার করা হয়েছে কিনা।

সাইপ্রাসের আদালতে সম্পত্তি ক্রোকের আদেশ জারির ঠিক এক দিন পর বাংলাদেশে একটি আদালত সাইফুল আলম এবং তার ১০ জন আত্মীয় ও সহযোগীকে পাঁচ মাসের কারাদণ্ড দিয়েছেন। ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড থেকে এস আলম গ্রুপের একটি সহযোগী সংস্থাকে দেওয়া প্রায় ৬০ লাখ ইউরোর (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৮০ কোটি টাকা) একটি ঋণের বিপরীতে ১৩৪টি বাস কেনার কথা থাকলেও তা কেনা হয়নি-এমন অভিযোগে করা মামলায় এই সাজা দেওয়া হয়।

তবে তার বিরুদ্ধে আনা সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করেছেন সাইফুল আলম। আন্তর্জাতিক আইনি সংস্থা ‘কুইন ইমানুয়েল’-এর মাধ্যমে দেওয়া এক বিবৃতিতে সাইফুল আলমের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তার সমস্ত আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ বৈধ বৈদেশিক উৎস থেকে অর্থায়িত এবং তার বিরুদ্ধে নেওয়া এই পদক্ষেপগুলো সম্পূর্ণ অন্যায্য ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। ইতিমধ্যে তিনি আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ বিরোধ নিষ্পত্তি সংস্থায় (আইসিএসআইডি) এই পদক্ষেপের বিরুদ্ধে আইনি প্রক্রিয়া শুরু করেছেন এবং দাবি করেছেন, সম্পত্তি জব্দের এই সিদ্ধান্তগুলো আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ সুরক্ষা চুক্তির লঙ্ঘন।

উল্লেখ্য, সাইফুল আলম ২০১৬ সালে সাইপ্রাসের বিতর্কিত সিটিজেন-বাই-ইনভেস্টমেন্ট প্রোগ্রামের (যা গোল্ডেন পাসপোর্ট নামে পরিচিত) মাধ্যমে দেশটির নাগরিকত্ব লাভ করেন। নানাবিধ বিতর্কের কারণে সাইপ্রাস সরকার পরে এই কার্যক্রম বন্ধ করে দিলেও, নাগরিকত্ব প্রদান প্রক্রিয়ার ত্রুটি-বিচ্যুতি তদন্তে গঠিত নিকোলাটোস কমিটির প্রতিবেদনে সাইফুল আলমের নামের কোনো উল্লেখ ছিল না।