বিআরটিএ-তে বড় রদবদল: ১৩ উপ-পরিচালককে বদলি
১০ অক্টোবর ২০২৬, ১:২৭ অপরাহ্ণ
বাংলাদেশে প্রায় তিন কোটি মানুষ কোনো না কোনো মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগছেন। অথচ আক্রান্তদের বড় অংশই প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও সহায়তা থেকে বঞ্চিত। দক্ষ জনবলের সংকট, সীমিত চিকিৎসাসুবিধা, সামাজিক কুসংস্কার ও সচেতনতার অভাব পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। এমন বাস্তবতায় আজ ১০ অক্টোবর পালিত হচ্ছে বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস। এবারের প্রতিপাদ্য- ‘জীবনের কথা শুনি, বাস্তব পরিবর্তন আনি’।
জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের ২০১৮-১৯ সালের জরিপ অনুযায়ী, বাংলাদেশের প্রাপ্তবয়স্কদের ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ এবং শিশু-কিশোরদের ১২ দশমিক ৬ শতাংশ কোনো না কোনো মানসিক রোগে আক্রান্ত। আক্রান্ত প্রাপ্তবয়স্কদের ৯২ দশমিক ৩ শতাংশ এবং শিশু-কিশোরদের ৯৪ দশমিক ৫ শতাংশ প্রয়োজনীয় মানসিক স্বাস্থ্যসেবা পাননি। প্রায় ১৮ কোটি মানুষের দেশে এ পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা প্রায় তিন কোটি বলে ধারণা করা হয়।
এবারের বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবসে মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার মধ্য দিয়ে যাওয়া মানুষের অভিজ্ঞতা ও মতামতকে গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানানো হচ্ছে। জাতিসংঘও নীতিনির্ধারণ ও চিকিৎসাসেবা ব্যবস্থায় তাঁদের অর্থবহ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার ওপর জোর দিয়েছে। জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের মতে, মানসিক স্বাস্থ্যসেবায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের বাদ না দিয়ে তাঁদের সঙ্গে অংশীদারত্ব গড়ে তুলতে হবে। পাশাপাশি আবাসন, শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও সামাজিক সহায়তা নিশ্চিত করে নিজস্ব পরিবেশে সুস্থ হয়ে ওঠার সুযোগ বাড়াতে হবে।
মানসিক স্বাস্থ্য বলতে শুধু মানসিক রোগকে বোঝায় না। মানুষের দৈনন্দিন জীবন, পারিবারিক সম্পর্ক, কাজ, পড়াশোনা ও সামাজিক যোগাযোগের সঙ্গেও এটি গভীরভাবে জড়িত। পারিবারিক দ্বন্দ্ব, সম্পর্কের টানাপোড়েন, বেকারত্ব, আর্থিক সংকট, প্রিয়জনের মৃত্যু, সামাজিক বৈষম্য ও মাদকাসক্তি মানসিক চাপ বাড়াতে পারে।
বর্তমান যুগে দৈনন্দিন কাজের চাপ, তীব্র প্রতিযোগিতা, সামাজিক অনিশ্চয়তা এবং অতিরিক্ত সামাজিক মাধ্যম (সোশ্যাল মিডিয়া) ব্যবহারের ফলে তরুণ সমাজসহ সর্বস্তরের মানুষের মধ্যে বিষণ্নতা ও উদ্বেগ আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। বিশেষ করে দীর্ঘদিনের মানসিক চাপ থেকে মানুষের কর্মক্ষমতা কমে যাওয়া এবং আত্মহত্যার মতো চরম সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রবণতা দেখা দিচ্ছে।
এর পাশাপাশি ইন্টারনেট ও মুঠোফোনের অতিরিক্ত ব্যবহার, অনলাইন জুয়া এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আসক্তি নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে। জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে বিষণ্ণতা, উদ্বেগজনিত রোগ, শুচিবায়ু, স্মৃতিভ্রংশ, দ্বিমেরু মেজাজজনিত রোগ, সিজোফ্রেনিয়া ও মাদকাসক্তির মতো সমস্যা রয়েছে। শিশু-কিশোরদের মধ্যে স্নায়ুবিকাশজনিত সমস্যা, উদ্বেগ ও আচরণগত সমস্যাও দেখা যায়।
তথ্য অনুযায়ী, ১২ থেকে ১৭ বছর বয়সীদের মধ্যে মাদক গ্রহণের হার দেড় শতাংশ এবং ৭ থেকে ১১ বছর বয়সীদের ক্ষেত্রে শূন্য দশমিক ২ শতাংশ। মানসিক কষ্টকে দুর্বলতা হিসেবে দেখা, চিকিৎসা নেওয়াকে লজ্জার বিষয় মনে করা কিংবা সময়ের সঙ্গে সমস্যা নিজে থেকেই সেরে যাবে বলে ধরে নেওয়ার কারণে অনেকে প্রয়োজনীয় সহায়তা চান না। অথচ বিষণ্ণতা, উদ্বেগ ও অন্যান্য মানসিক সমস্যায় আক্রান্ত ব্যক্তির যথাসময়ে চিকিৎসা ও পারিবারিক সহযোগিতা পাওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘস্থায়ী মানসিক সংকট আত্মহত্যার ঝুঁকিও বাড়াতে পারে। সচেতনতা বৃদ্ধি, দ্রুত সমস্যা শনাক্তকরণ এবং সহজলভ্য চিকিৎসার মাধ্যমে অনেক গুরুতর পরিস্থিতি প্রতিরোধ করা সম্ভব।
বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবসের এবারের প্রতিপাদ্য শুধু আক্রান্ত ব্যক্তিদের অভিজ্ঞতা শোনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; সেই অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে কার্যকর পরিবর্তন আনারও আহ্বান জানায়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার মধ্য দিয়ে যাওয়া মানুষকে শুধু নিজেদের কথা বলার সুযোগ দিলেই হবে না। নীতি প্রণয়ন, চিকিৎসাসেবার পরিকল্পনা, বাস্তবায়ন ও মূল্যায়নেও তাঁদের অর্থবহ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।
খোলামেলা আলোচনা: পরিবার ও বন্ধুর আড্ডায় মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কথা বলার মানসিকতা গড়ে তুলতে হবে। মন খারাপ বা কোনো চাপ অনুভব করলে তা বিশ্বস্ত কারো কাছে শেয়ার করা উচিত।
সহানুভূতিশীল দৃষ্টিভঙ্গি: পরিবার বা কর্মক্ষেত্রে কেউ মানসিক কষ্টে থাকলে তাঁকে খোটা না দিয়ে সহানুভূতি ও সহমর্মিতার সঙ্গে তাঁর কথা শুনতে হবে।
পেশাদার সেবা গ্রহণ: মানসিক রোগ কোনো পাপ বা লজ্জার বিষয় নয়। প্রয়োজনে অবহেলা না করে দ্রুত মনোরোগ বিশেষজ্ঞ বা কাউন্সিলরের পরামর্শ নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।
শারীরিক চর্চা ও বিশ্রাম: নিয়মিত পর্যাপ্ত ঘুম, সুষম খাদ্য গ্রহণ, শরীরচর্চা এবং স্ক্রিন টাইম (ফোন বা ল্যাপটপের ব্যবহার) কমানো মানসিক সুস্থতার জন্য অত্যন্ত কার্যকরী।