রবিবার, ১৭ মে, ২০২৬

নিরাপদ সড়কে বড় বাধা নিবন্ধনহীন ড্রাইভিং স্কুল


দেশে সড়ক দুর্ঘটনা কমাতে শুধু কঠোর আইন করলেই যথেষ্ট নয়, তার কার্যকর বাস্তবায়নও নিশ্চিত করতে হবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, নিবন্ধনহীন ও নবায়নবিহীন ড্রাইভিং স্কুলগুলো অদক্ষ চালক তৈরি করে জননিরাপত্তাকে ঝুঁকির মুখে ফেলছে। তাই বৈধতা যাচাই, নিয়মিত মনিটরিং, প্রশিক্ষণের মান উন্নয়ন এবং অনুমোদনহীন প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ এখন সময়ের দাবি।
নিরাপদ সড়কে বড় বাধা নিবন্ধনহীন ড্রাইভিং স্কুল
  গুগল নিউজে ফলো করে আজকের প্রসঙ্গ এর সাথে থাকুন

নজরদারির অভাবে বাড়ছে অদক্ষ চালক, ঝুঁকিতে জননিরাপত্তা দেশে সড়ক দুর্ঘটনা কমাতে নানা উদ্যোগ নেওয়া হলেও অদক্ষ চালক তৈরির অন্যতম উৎস হিসেবে উঠে আসছে নিবন্ধনহীন ও নবায়নবিহীন ড্রাইভিং স্কুল। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন জেলা, উপজেলা ও পাড়া-মহল্লায় ব্যাঙের ছাতার মতো গড়ে উঠেছে অসংখ্য অনুমোদনহীন ড্রাইভিং প্রশিক্ষণ কেন্দ্র। যথাযথ তদারকি ও মনিটরিং না থাকায় এসব প্রতিষ্ঠান থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে অনেকেই সড়কে গাড়ি চালাচ্ছেন, যা জননিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, অধিকাংশ ড্রাইভিং স্কুলে নেই কোনো মানসম্মত প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা, দক্ষ প্রশিক্ষক কিংবা বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) অনুমোদিত কারিকুলাম। অনেক প্রতিষ্ঠানে হাতে-কলমে প্রশিক্ষণের পরিবর্তে শুধুমাত্র কয়েকদিন গাড়ি চালিয়ে দেখিয়েই “প্রশিক্ষণ সম্পন্ন” বলে সনদ দেওয়া হচ্ছে। ফলে সড়কে বাড়ছে অদক্ষ ও অনভিজ্ঞ চালকের সংখ্যা।

নিরাপদ সড়ক নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন সংগঠনের তথ্যমতে, দেশে সংঘটিত বহু সড়ক দুর্ঘটনার পেছনে অপর্যাপ্ত ও নিম্নমানের প্রশিক্ষণ একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একজন চালকের শুধু গাড়ি চালানো জানলেই হয় না; ট্রাফিক আইন, সড়ক নিরাপত্তা, জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলা এবং মানবিক আচরণ সম্পর্কেও সঠিক প্রশিক্ষণ প্রয়োজন। কিন্তু বেশিরভাগ অবৈধ ড্রাইভিং স্কুলে এসব বিষয়ে কোনো গুরুত্ব দেওয়া হয় না।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কিছু ড্রাইভিং স্কুল ১৫ থেকে ২০ বছর আগের নিবন্ধন সনদ ব্যবহার করে এখনও কার্যক্রম পরিচালনা করছে। অথচ বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮ অনুযায়ী ড্রাইভিং স্কুলের নিবন্ধন প্রতি পাঁচ বছর পরপর নবায়ন বাধ্যতামূলক। কিন্তু বাস্তবে বহু প্রতিষ্ঠানের কোনো নবায়ন নেই। অনেক প্রতিষ্ঠান আবার কোনো নিবন্ধন ছাড়াই প্রকাশ্যে ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে।
আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, অনেক ড্রাইভিং স্কুলের ভেতরে অন্য ব্যবসায়িক কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। কোথাও গ্যারেজ, কোথাও গাড়ির পার্টস বিক্রি, আবার কোথাও অফিস ভাড়া দিয়ে একই স্থানে ড্রাইভিং প্রশিক্ষণ পরিচালনা করা হচ্ছে। এতে প্রশিক্ষণের পরিবেশ নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তাও বিঘ্নিত হচ্ছে।

রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে দেখা যায়, ছোট ছোট সাইনবোর্ড টাঙিয়ে অস্থায়ী অফিস খুলে চলছে ড্রাইভিং প্রশিক্ষণ কার্যক্রম। কোথাও নেই পর্যাপ্ত খোলা জায়গা, নেই নির্ধারিত প্রশিক্ষণ মাঠ কিংবা প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা। অনেক প্রতিষ্ঠানে প্রশিক্ষক হিসেবেও কাজ করছেন অনভিজ্ঞ ব্যক্তিরা, যাদের নিজস্ব দক্ষতা ও বৈধতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।

সড়ক নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমানে দেশে মোটরযানের সংখ্যা দ্রুত বাড়লেও সেই তুলনায় দক্ষ চালক তৈরির কার্যকর উদ্যোগ খুবই সীমিত। এই সুযোগে একশ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী শুধুমাত্র আর্থিক লাভের আশায় অবৈধ ড্রাইভিং স্কুল পরিচালনা করছে। ফলে নতুন চালকদের মধ্যে ট্রাফিক আইন মানার প্রবণতা কমে যাচ্ছে এবং দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ছে।

বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা “পাথওয়ে” দীর্ঘদিন ধরে নিরাপদ সড়ক ও জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। সংস্থাটির পক্ষ থেকে বলা হয়, অবৈধ ও নবায়নবিহীন ড্রাইভিং স্কুলের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে সড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা কঠিন হবে। সংস্থাটি ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, শুধু অভিযান চালালেই হবে না; ড্রাইভিং প্রশিক্ষণ ব্যবস্থাকে আধুনিক ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন করতে হবে। পাশাপাশি নিয়মিত মনিটরিং, প্রশিক্ষকদের দক্ষতা যাচাই, নিবন্ধন নবায়ন নিশ্চিতকরণ এবং অনুমোদনহীন প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে।
তাঁদের মতে, নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করতে হলে প্রথমেই প্রয়োজন দক্ষ ও দায়িত্বশীল চালক তৈরি করা। আর সেই লক্ষ্য পূরণে অবৈধ ও নিম্নমানের ড্রাইভিং স্কুল বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার বিকল্প নেই।