‘আমি ধর্ষণ করছি, মারছে ডলার’-আদালতে আনার পথে মূল অভিযুক্তের দাবি
৪ জুন ২০২৬, ৮:৫২ পূর্বাহ্ণ
রাজধানীর মিরপুরে নিজ ফ্ল্যাট থেকে ৭৫ বছর বয়সী বৃদ্ধা মা নূরজাহান বেগমের পচা-গলা ও পোকা ধরা মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় তাঁর সন্তানদের বিরুদ্ধে চরম অবহেলার অভিযোগ উঠেছে। দেশজুড়ে তীব্র সমালোচনা ও সামাজিক ক্ষোভের মুখে অবশেষে তাঁর বড় ছেলে সরকারের যুগ্ম সচিব ড. এ কে এম আনিসুর রহমানকে বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওএসডি) করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত করা হয়েছে।
বুধবার (৩ জুন) সন্ধ্যায় জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে এ-সংক্রান্ত একটি জরুরি প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, বর্তমানে মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের সদস্য (প্রকৌশল ও উন্নয়ন) হিসেবে কর্মরত এই কর্মকর্তাকে বৃহস্পতিবারের (৪ জুন) মধ্যে নতুন কর্মস্থলে যোগ দিতে হবে, অন্যথায় তিনি তাৎক্ষণিক অবমুক্ত (স্ট্যান্ড রিলিজড) বলে গণ্য হবেন।
জানা গেছে, গত রোববার রাজধানীর মিরপুর-১১ (পল্লবী সেকশন-৬) এলাকার একটি বহুতল ভবনের চতুর্থ তলার ফ্ল্যাট থেকে নূরজাহান বেগমের গলিত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। জাতীয় জরুরি সেবা নম্বর ৯৯৯-এ ফোন পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে অত্যন্ত নোংরা ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে বৃদ্ধার নিথর দেহ পায়, যাতে ততক্ষণে পোকা ও ফাঙ্গাস ধরে গিয়েছিল। অত্যন্ত মর্মান্তিক বিষয় হলো, ওই ফ্ল্যাটেরই পাশের কক্ষে তাঁর স্কুলশিক্ষক মেয়ে বসবাস করলেও তিনি মায়ের মৃত্যুর কোনো খবর পুলিশ বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে অবগত করেননি। ধারণা করা হচ্ছে, উদ্ধারের ৩-৪ দিন আগেই ওই বৃদ্ধার মৃত্যু হয়েছিল।
নূরজাহান বেগমের সন্তানরা প্রত্যেকেই সমাজে উচ্চ সুপ্রতিষ্ঠিত ও উচ্চশিক্ষিত। তাঁর এক ছেলে সরকারের যুগ্ম সচিব, মেজ ছেলে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) শিক্ষক এবং একমাত্র মেয়ে স্থানীয় একটি স্কুলের শিক্ষিকা। সন্তানরা উচ্চপদস্থ ও সামাজিকভাবে প্রভাবশালী হওয়া সত্ত্বেও মায়ের এমন একাকী জীবনযাপন এবং মৃত্যুর পর মরদেহে পচন ধরার ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দেয়। এ বিষয়ে কথা বলতে যুগ্ম সচিব ড. আনিসুর রহমানের ফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি তা রিসিভ করেননি।
এ ঘটনায় আইনি ও প্রশাসনিক পদক্ষেপের বিষয়ে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী মো. আব্দুল বারী বুধবার গণমাধ্যমকে বলেন, "অবশ্যই বিষয়টি আমাদের বিবেচনায় রয়েছে। আইন অনুযায়ী যা করণীয়, সেটাই করা হবে।" তিনি আরও জানান, বিষয়টি গুরুত্বের সাথে যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে এবং প্রচলিত আইন ও বিধান অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। একই সাথে তিনি ২০১৩ সালের 'পিতা-মাতার ভরণপোষণ আইন' ও ২০২৩ সালের বিধিমালার কথা উল্লেখ করে বলেন, "একটা আইন আছে, যেখানে বাবা-মায়ের ভরণপোষণ সংক্রান্ত বিধান রয়েছে। সেটি কার্যকর থাকলে আইন অনুযায়ী আমরা ব্যবস্থা নেব।" প্রতিমন্ত্রীর এই কঠোর অবস্থানের পরই বুধবার রাতে ওই কর্মকর্তাকে ওএসডি করার প্রজ্ঞাপন জারি হয়।
উল্লেখ্য, ২০১৩ সালের পিতা-মাতার ভরণপোষণ আইন অনুযায়ী, প্রত্যেক সন্তানকে পিতা-মাতার অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা ও পরিচর্যা নিশ্চিত করতে হবে। একাধিক সন্তান থাকলে নিজেরা আলোচনা করে এটি নির্ধারণ করবেন এবং নিয়মিত তাঁদের স্বাস্থ্যের খোঁজখবর রাখবেন। এই আইন অমান্য করলে অনূর্ধ্ব ১ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা অর্থদণ্ড অনাদায়ে অনূর্ধ্ব ৩ মাস কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। উচ্চশিক্ষিত সন্তানদের এমন চরম অমানবিক আচরণ ও অবহেলায় এক মায়ের করুণ বিদায়ের এই ঘটনাটি দেশের প্রবীণ নাগরিকদের সামাজিক নিরাপত্তা ও পারিবারিক দায়িত্ববোধের বিষয়টি নিয়ে নতুন করে বড় ধরনের প্রশ্ন তুলেছে।