জুলাই গণঅভ্যুত্থান আইন ২০২৬ পাস: অংশগ্রহণকারীদের সুরক্ষা ও মামলা প্রত্যাহারের বিধান
১৫ মার্চ ২০২৬, ৭:১৭ অপরাহ্ণ
আশুলিয়ায় ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সময় ছয়জনকে গুলি করে হত্যা এবং তাদের লাশ ভ্যানে করে নিয়ে পুড়িয়ে দেওয়ার ঘটনায় করা মামলায় সাবেক সংসদ সদস্য মুহাম্মদ সাইফুল ইসলামসহ ছয় আসামির মৃত্যুদণ্ডের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ করেছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল–২।
বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনাল রায়ে স্বাক্ষর করার পর রোববার (১৫ মার্চ) ৫৯১ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ করা হয়। এতে অপরাধ সংঘটনের পদ্ধতি, আসামিদের ভূমিকা এবং তদন্তে পাওয়া তথ্যপ্রমাণের বিস্তারিত বর্ণনা তুলে ধরা হয়েছে।
মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ছয় আসামি হলেন- সাবেক সংসদ সদস্য মুহাম্মদ সাইফুল ইসলাম, আশুলিয়া থানার সাবেক ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এ এফ এম সায়েদ, সাবেক উপপরিদর্শক (এসআই) আবদুল মালেক, সাবেক সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) বিশ্বজিৎ সাহা, সাবেক কনস্টেবল মুকুল চোকদার এবং যুবলীগের ক্যাডার রনি ভূঁইয়া।
এ মামলায় আরও সাতজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। তারা হলেন - ঢাকা রেঞ্জের সাবেক ডিআইজি সৈয়দ নুরুল ইসলাম, ঢাকা জেলার সাবেক পুলিশ সুপার মো. আসাদুজ্জামান রিপন, সাবেক অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আবদুল্লাহিল কাফী, সাভার সার্কেলের সাবেক অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. শহিদুল ইসলাম, সাবেক পরিদর্শক মোহাম্মদ মাসুদুর রহমান, সাবেক পরিদর্শক নির্মল কুমার দাস এবং ঢাকা জেলা পুলিশের গোয়েন্দা শাখার (ডিবি উত্তর) সাবেক পরিদর্শক মো. আরাফাত হোসেন। এ ছাড়া আশুলিয়া থানার সাবেক এসআই আরাফাত উদ্দীন ও কামরুল হাসানকে সাত বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে একই থানার সাবেক এসআই শেখ আবজালুল হককে ক্ষমা করা হয়েছে, কারণ তিনি মামলায় অ্যাপ্রুভার বা রাজসাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দিয়েছেন।
রায়ের পর্যবেক্ষণে ট্রাইব্যুনাল উল্লেখ করেন, কয়েকজন পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে লাশ পোড়ানোর ঘটনায় সরাসরি অংশগ্রহণের পর্যাপ্ত সাক্ষ্য-প্রমাণ প্রসিকিউশন পক্ষ উপস্থাপন করতে পারেনি। অভিযোগগুলো গুরুতর হলেও তাদের সংশ্লিষ্টতার মাত্রা যথাযথভাবে প্রমাণিত না হওয়ায় অনেকের সাজা কমানো হয়েছে। তাদের দায় মূলত ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে পরিচালিত অভিযানে সহায়তার মধ্যে সীমিত বলে উল্লেখ করা হয়।
এর আগে গত ৫ ফেব্রুয়ারি এ মামলার সংক্ষিপ্ত রায় ঘোষণা করা হয়েছিল। রোববার প্রকাশিত হয়েছে তার পূর্ণাঙ্গ রায়। মামলায় মোট আসামি ১৬ জন। তাদের মধ্যে আটজন গ্রেফতার হয়ে কারাগারে রয়েছেন। তারা হলেন- আবদুল্লাহিল কাফী (যাবজ্জীবন), শহিদুল ইসলাম (যাবজ্জীবন), আরাফাত হোসেন (যাবজ্জীবন), আবদুল মালেক (মৃত্যুদণ্ড), আরাফাত উদ্দীন (৭ বছর), কামরুল হাসান (৭ বছর), শেখ আবজালুল হক (ক্ষমাপ্রাপ্ত) এবং মুকুল চোকদার (মৃত্যুদণ্ড)। অন্য আট আসামি বর্তমানে পলাতক। তারা হলেন - সাইফুল ইসলাম (মৃত্যুদণ্ড), সৈয়দ নুরুল ইসলাম (যাবজ্জীবন), আসাদুজ্জামান রিপন (যাবজ্জীবন), এ এফ এম সায়েদ (মৃত্যুদণ্ড), মাসুদুর রহমান (যাবজ্জীবন), নির্মল কুমার দাস (যাবজ্জীবন), বিশ্বজিৎ সাহা (মৃত্যুদণ্ড) এবং যুবলীগ ক্যাডার রনি ভূঁইয়া (মৃত্যুদণ্ড)।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের সময় আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের দিন আশুলিয়া থানা এলাকায় ছয়জনকে গুলি করে হত্যা করা হয়। পরে তাদের মরদেহ ভ্যানে তুলে পুড়িয়ে দেওয়া হয়। নিহতদের মধ্যে ছিলেন সাজ্জাদ হোসেন, আস-সাবুর, তানজিল মাহমুদ, বায়েজিদ বোস্তামী ও আবুল হোসেনসহ ছয়জন।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের ঘটনায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল–২ থেকে এটিই প্রথম রায়। এর আগে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল–১ একই ধরনের দুটি মামলার রায় দিয়েছেন। এর মধ্যে এক মামলায় গত ১৭ নভেম্বর ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। একই মামলার আরেক আসামি সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন দোষ স্বীকার করে রাজসাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দেওয়ায় তাকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। এ ছাড়া গত ২৬ জানুয়ারি রাজধানীর চানখাঁরপুল এলাকায় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের ঘটনায় ঢাকা মহানগর পুলিশের সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমানসহ তিন আসামিকে মৃত্যুদণ্ড এবং অন্য পাঁচজনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেন ট্রাইব্যুনাল–১।