সোমবার, ১৭ আগস্ট, ২০২৬

শামসুর রাহমানের ২০তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ


‘স্বাধীনতার কবি’ ও ‘কবিতার বরপুত্র’ খ্যাত বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান কবি শামসুর রাহমানের ২০তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ। ২০০৬ সালের ১৭ আগস্ট চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৭৬ বছর বয়সে মারা যান আধুনিক বাংলা কবিতার এই বরেণ্য কবি।

১৭ আগস্ট ২০২৬, ১০:৩২ পূর্বাহ্ণ 

শামসুর রাহমানের ২০তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ
  গুগল নিউজে ফলো করে আজকের প্রসঙ্গ এর সাথে থাকুন

‘স্বাধীনতার কবি’, ‘কবিতার বরপুত্র’- বিভিন্ন অভিধায় যিনি বাংলা কবিতায় অমর হয়ে আছেন, সেই বরেণ্য কবি শামসুর রাহমানের ২০তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ। ২০০৬ সালের এই দিনে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৭৬ বছর বয়সে অনন্তলোকে পাড়ি জমান তিনি।

কবির ইচ্ছা অনুযায়ী ঢাকার বনানী কবরস্থানে তার মায়ের কবরের পাশে তাকে সমাহিত করা হয়। শামসুর রাহমানের মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে জাতীয় পর্যায়ে বড় কোনো কর্মসূচির খবর পাওয়া যায়নি। তবে বনানী কবরস্থানে কবির সমাধিতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানাবেন পরিবারের সদস্য, স্বজন, বন্ধু ও শুভানুধ্যায়ীরা। এছাড়া দেশে-বিদেশে থাকা কবি ও সাহিত্যানুরাগীরা ওয়েবিনারসহ বিভিন্ন আয়োজনের মাধ্যমে তাকে স্মরণ করতে পারেন।

কবিতায় নাগরিক জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতা

আধুনিক বাংলা কবিতায় নাগরিক জীবন, প্রেম, প্রকৃতি ও সমকালীন রাজনৈতিক বাস্তবতাকে অনন্য শিল্পভাষায় তুলে ধরেছেন শামসুর রাহমান। তার কবিতায় ব্যক্তিগত অনুভূতির পাশাপাশি ফুটে উঠেছে মানুষের অধিকার, স্বাধীনতা, গণতন্ত্র ও মুক্তির আকাঙ্ক্ষা।

১৯২৯ সালের ২৩ অক্টোবর পুরান ঢাকার মাহুতটুলীতে জন্মগ্রহণ করেন শামসুর রাহমান। তার পৈতৃক বাড়ি নরসিংদীর পাড়াতলী গ্রামে। পোগোজ স্কুল থেকে ম্যাট্রিকুলেশন পাসের পর তিনি ঢাকা কলেজে পড়াশোনা করেন। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি সাহিত্য অধ্যয়ন করেন। ছাত্রজীবন থেকেই কবিতার প্রতি তার গভীর অনুরাগ তৈরি হয়।

১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান শামসুর রাহমানের কবিসত্তায় গভীর প্রভাব ফেলে। শহীদ আসাদের রক্তাক্ত শার্ট তাকে নাড়া দেয়। সেই প্রেরণা থেকেই তিনি রচনা করেন কালজয়ী কবিতা ‘আসাদের শার্ট’। কবিতাটিতে একটি রক্তাক্ত শার্ট হয়ে ওঠে প্রতিবাদী মানুষের প্রতীক এবং ব্যক্তির মৃত্যু রূপ নেয় সামষ্টিক প্রতিরোধের শক্তিতে।

মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার কবি

মুক্তিযুদ্ধ শামসুর রাহমানের কবিসত্তাকে আরও গভীরভাবে প্রভাবিত করে। ১৯৭১ সালে যুদ্ধের সময় পৈতৃক গ্রাম পাড়াতলীতে অবস্থান করে তিনি রচনা করেন ‘স্বাধীনতা তুমি’ ও ‘তোমাকে পাওয়ার জন্যে হে স্বাধীনতা’।

‘স্বাধীনতা তুমি’ কবিতায় স্বাধীনতাকে তিনি মানুষের স্বপ্ন, ভালোবাসা ও জীবনের নানা অনুষঙ্গের সঙ্গে মিলিয়ে দেখেছেন। অন্যদিকে ‘তোমাকে পাওয়ার জন্যে হে স্বাধীনতা’ কবিতায় স্বাধীনতা অর্জনের পেছনে থাকা রক্ত, মৃত্যু, নির্যাতন ও মানুষের আত্মত্যাগের চিত্র উঠে এসেছে। এ দুটি কবিতা তাকে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম প্রধান কবি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।

সাংবাদিকতা ও সাহিত্যচর্চা

কবিতার পাশাপাশি সাংবাদিকতাতেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন শামসুর রাহমান। ১৯৫৭ সালে দৈনিক মর্নিং নিউজে সাংবাদিক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন তিনি। পরে ১৯৭৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে দৈনিক বাংলা ও সাপ্তাহিক বিচিত্রার সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব নেন। ১৯৮৭ সালে তাকে পদত্যাগ করতে হয়। এরপর তিনি ‘অধুনা’ নামের মাসিক সাহিত্য পত্রিকার সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

কবিতার পাশাপাশি উপন্যাস, প্রবন্ধ, স্মৃতিকথা, ছড়া ও গল্পও লিখেছেন তিনি। অনুবাদ সাহিত্যেও তার উল্লেখযোগ্য অবদান রয়েছে। তার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ‘প্রথম গান, দ্বিতীয় মৃত্যুর আগে’, ‘রৌদ্র করোটিতে’, ‘নিজ বাসভূমে’ ও ‘বন্দী শিবির থেকে’সহ বহু কাব্যগ্রন্থ।

বাংলা সাহিত্যে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি আদমজী সাহিত্য পুরস্কার, বাংলা একাডেমি পুরস্কার, একুশে পদক ও স্বাধীনতা পদকসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পুরস্কারে ভূষিত হন।

বাংলা কবিতায় নাগরিক জীবন, রাজনৈতিক চেতনা ও স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষাকে যে শক্তিশালী কণ্ঠে ধারণ করেছিলেন শামসুর রাহমান, তার সাহিত্যকর্ম আজও পাঠক ও নতুন প্রজন্মের কবিদের অনুপ্রেরণা জোগায়। মৃত্যুর দুই দশক পরও বাংলা সাহিত্যে তার সৃষ্টি ও কণ্ঠ সমানভাবে প্রাসঙ্গিক।