বুধবার, ১ জুলাই, ২০২৬

জলবায়ু পরিবর্তন ও এল নিনোর তাণ্ডব: জুনে বিশ্বজুড়ে সমুদ্রের বৃদ্ধির রেকর্ড তাপমাত্রা


মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তন এবং উদীয়মান প্রাকৃতিক আবহাওয়া চক্র ‘এল নিনো’-র যৌথ প্রভাবে ইতিহাসের সবচেয়ে উষ্ণ জুনের সাক্ষী হলো বৈশ্বিক মহাসাগরগুলো। ইউরোপীয় ইউনিয়নের সামুদ্রিক পরিবেশ পর্যবেক্ষণ সংস্থা ‘কোপার্নিকাস মেরিন সার্ভিস’ গত বুধবার (১ জুলাই) এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, ২০২৬ সালের জুন মাসে সমুদ্রপৃষ্ঠের গড় তাপমাত্রা অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে ২১.০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছেছে। বিজ্ঞানীদের আশঙ্কা, প্রশান্ত মহাসাগরে একটি শক্তিশালী এল নিনো পরিস্থিতি দানা বেঁধে ওঠায় আগামী মাসগুলোতে সমুদ্রের তাপমাত্রা বৃদ্ধির এই ধারা আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে এবং ২০২৬ সালটি ইতিহাসের উষ্ণতম বছর হিসেবে পরিগণিত হতে পারে।

১ জুলাই ২০২৬, ৯:২১ অপরাহ্ণ 

জলবায়ু পরিবর্তন ও এল নিনোর তাণ্ডব: জুনে বিশ্বজুড়ে সমুদ্রের বৃদ্ধির রেকর্ড তাপমাত্রা
  গুগল নিউজে ফলো করে আজকের প্রসঙ্গ এর সাথে থাকুন

ইউরোপীয় ইউনিয়নের পরিবেশ পর্যবেক্ষণ প্রক্রিয়ার অংশ কোপার্নিকাস মেরিন সার্ভিস তাদের বিবৃতিতে জানায়, ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাস জুড়েই বিশ্বজুড়ে সমুদ্রের তাপমাত্রা ছিল অস্বাভাবিক ঊর্ধ্বমুখী। ২০২৩ এবং ২০২৪ সালের জুন মাসের রেকর্ড ভাঙা গরমকেও এবারের জুনের তাপমাত্রা ছাড়িয়ে গেছে। এই চরম উষ্ণতার কারণে বিশ্বের প্রায় ৮২ শতাংশ মহাসাগরীয় অঞ্চল দীর্ঘস্থায়ী এবং ব্যাপক সামুদ্রিক তাপপ্রবাহ বা ‘মেরিন হিটওয়েভ’-এর কবলে পড়েছে।

সংস্থার প্রধান সমুদ্রবিজ্ঞানী সাইমন ভ্যান গেনিপ চলমান পরিস্থিতিকে অত্যন্ত উদ্বেগজনক বলে আখ্যা দিয়েছেন। তিনি জানান: "সামুদ্রিক তাপপ্রবাহের এই অবিরাম বিস্তার ভূমধ্যসাগর, উত্তর আটলান্টিকের মধ্যাঞ্চল এবং নিরক্ষীয় প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলসহ বৈশ্বিক সমুদ্রের বিশাল অংশকে গ্রাস করেছে। এই চিত্র স্পষ্ট করে যে, আমাদের মহাসাগরগুলো বর্তমানে এক অভূতপূর্ব ও দীর্ঘস্থায়ী তাপীয় চাপের (থার্মাল স্ট্রেস) মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।"

বিজ্ঞানীদের মতে, ২০২৬ সালের জুনে অফিশিয়ালি শুরু হওয়া এই শক্তিশালী ‘এল নিনো’ পরিস্থিতি আগামী বছর পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে। সাধারণত প্রশান্ত মহাসাগরের ক্রান্তীয় অঞ্চলের পানি স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি উষ্ণ হলে এল নিনোর সৃষ্টি হয়, যা বায়ুমণ্ডলে বিপুল পরিমাণ অতিরিক্ত তাপ ছড়িয়ে দেয়। এর ফলে বিশ্বজুড়ে বায়ুপ্রবাহ, মেঘ এবং বৃষ্টিপাতের স্বাভাবিক নিয়ম ও গতিপ্রকৃতি সম্পূর্ণ ওলটপালট হয়ে যায়। অতীতে এল নিনোর প্রভাবে পেরুতে আকস্মিক ভয়াবহ বন্যা, আফ্রিকার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে তীব্র খরা এবং অস্ট্রেলিয়ায় নিয়ন্ত্রণহীন বিধ্বংসী দাবানলের মতো চরম আবহাওয়া দেখা গেছে।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের জলবায়ু পর্যবেক্ষণ সংস্থা ‘কোপার্নিকাস ক্লাইমেট চেঞ্জ সার্ভিস’-এর পরিচালক কার্লো বুওনটেম্পো সতর্ক করে বলেন, "সমুদ্রের বর্তমান অবস্থা ও সম্ভাব্য এল নিনো বিবেচনায় আগামী মাসগুলোতে তাপমাত্রা বৃদ্ধির নতুন নতুন রেকর্ড তৈরির আশঙ্কা আছে। বর্তমান পরিস্থিতি আবহাওয়ার একটি চরম বৈরী ও নতুন ধাপের ইঙ্গিত দিচ্ছে, যা আমাদের সম্পূর্ণ এক অজানা ও বিপজ্জনক পরিস্থিতির দিকে নিয়ে যেতে পারে।"

এর আগে ২০২৩ থেকে শুরু হওয়া সর্বশেষ এল নিনোটির সমাপ্তি ঘটেছিল ২০২৪ সালে, যার ফলে ২০২৪ সালটি তৎকালীন ইতিহাসের উষ্ণতম বছরের তকমা পেয়েছিল। তবে চলতি বছরের সম্ভাব্য এল নিনোটি কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী হতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে, যা ২০২৬ সালকে আগের সব রেকর্ড ভেঙে ইতিহাসের সবচেয়ে তপ্ত বছর বানিয়ে ছাড়বে বলে বিজ্ঞানীদের শঙ্কা।

জাতিসংঘের সাম্প্রতিক এক মূল্যায়নেও এই সংকটের গভীরতা ফুটে উঠেছে। সেখানে উল্লেখ করা হয়, বিশ্বের মহাসাগরগুলো এখন এক গভীর ও নজিরবিহীন সংকটের মুখোমুখি। কারণ সমুদ্রের পানি এখন অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক দ্রুত গতিতে উষ্ণ হচ্ছে এবং বরফ গলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ছে।

পৃথিবীর সামগ্রিক জলবায়ুর ভারসাম্য ঠিক রাখতে মহাসাগরগুলো স্পঞ্জের মতো কাজ করে। গ্রিনহাউস গ্যাসের কারণে বায়ুমণ্ডলে যে অতিরিক্ত তাপ তৈরি হয়, তার প্রায় ৯০ শতাংশই মহাসাগরগুলো নিজেদের বুকে শুষে নেয়। তবে সমুদ্রের পানি অতিরিক্ত উষ্ণ হয়ে পড়লে তা বায়ুমণ্ডলে জলীয় বাষ্পের পরিমাণ বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। এই অতিরিক্ত জলীয় বাষ্পই পরবর্তীতে দানবীয় ক্রান্তীয় ঘূর্ণিঝড় (ট্রপিক্যাল সাইক্লোন) এবং অতিবৃষ্টির মূল জ্বালানি হিসেবে কাজ করে। একই সাথে, তাপের কারণে পানির স্বাভাবিক সম্প্রসারণের ফলে সমুদ্রের উচ্চতা বাড়ছে এবং দীর্ঘস্থায়ী তাপপ্রবাহের কারণে সমুদ্রের প্রাণ বা প্রবালপ্রাচীর (কোরাল রিফ) ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে মারা যাচ্ছে, যা সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্রের জন্য এক বিরাট বিপর্যয়।