ঢাকাসহ ৫ অঞ্চলে ঝড়ো হাওয়ার সতর্কতা, থাকতে পারে বজ্রসহ বৃষ্টি
৩০ ডিসেম্বর ২০২৫, ৪:০৭ অপরাহ্ণ
বাংলার রাজনৈতিক আকাশের সেই সুউচ্চ নক্ষত্রটি আজ শান্ত হলো, যা গত চার দশক ধরে কখনও তীব্র দহনে পুড়েছে, আবার কখনও কোটি মানুষের হৃদয়ে আশার আলো হয়ে জ্বলেছে। বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী এবং জাতীয়তাবাদী রাজনীতির অপ্রতিদ্বন্দ্বী নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া আজ চিরবিদায় নিলেন। তাঁর প্রয়াণে কেবল একটি রাজনৈতিক যুগের অবসান ঘটেনি, বরং বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক সংগ্রামের এক জীবন্ত ইতিহাসের মহাপ্রয়াণ ঘটলো।
গৃহবধূ থেকে হিমাদ্রি সমান উচ্চতায়
বেগম জিয়ার জীবন পরিক্রমা রূপকথার চেয়েও রোমাঞ্চকর। সেনানিবাসের নিভৃত জীবন থেকে উত্তাল রাজপথ—এই রূপান্তর ছিল সময়ের দাবি। ১৯৮১ সালে স্বামী জিয়াউর রহমানের শাহাদাতের পর যখন বিএনপি ভাঙনের মুখে, তখন দুই শিশুপুত্রকে আগলে রাখা এক শান্ত গৃহবধূ দলের হাল ধরেন। অতি সাধারণ এক নারী থেকে যেভাবে তিনি ‘আপসহীন’ নেত্রীতে রূপান্তরিত হলেন, তা বিশ্ব রাজনীতির ইতিহাসে এক বিস্ময়। ৯ বছরের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে এরশাদ সরকারের কোনো প্রলোভন বা রক্তচক্ষু তাঁকে টলাতে পারেনি। সেই অটল সাহসই তাঁকে দিয়েছিল ‘দেশনেত্রী’র অক্ষয় মর্যদা।
রাজনীতিতে অপূরণীয় ক্ষতি ও শূন্যতা
বেগম খালেদা জিয়ার চলে যাওয়া দেশের জাতীয়তাবাদী রাজনীতির জন্য এক অপূরণীয় ধাক্কা। তিনি ছিলেন এমন একজন নেত্রী, যিনি শত প্রতিকূলতা, কারাবরণ এবং শারীরিক অসুস্থতার মাঝেও নিজ আদর্শ থেকে বিচ্যুত হননি। তাঁর মৃত্যুতে বিএনপি হারাল তাদের একমাত্র অভিভাবক, আর দেশ হারাল ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষার এক অতন্দ্র প্রহরীকে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, "খালেদা জিয়া ছিলেন বাংলাদেশের সংসদীয় গণতন্ত্রের এক অবিচ্ছেদ্য স্তম্ভ। তাঁর অভাব কেবল একটি দল নয়, বরং সমগ্র রাষ্ট্রব্যবস্থায় দীর্ঘকাল অনুভূত হবে।"
শোকাতুর বাংলাদেশ: স্তব্ধ জনপদ
আজকের সকালটি ছিল অন্যরকম বিষণ্ণ। রেডিও-টেলিভিশনে কোরআন তেলাওয়াত আর শোকের সুরের মাঝে গোটা দেশ যেন থমকে গেছে। তাঁর মৃত্যুতে কেবল দলীয় নেতাকর্মীরাই কাঁদছেন না, বরং দলমত নির্বিশেষে সাধারণ মানুষও শোকাহত। দেশের প্রতিটি জেলা ও উপজেলায় গায়েবানা জানাজা ও দোয়ার আয়োজন করা হয়েছে। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ের নেতারা গভীর শোক প্রকাশ করে বলেছেন, "বাংলাদেশের নারী শিক্ষার প্রসার, সামাজিক উন্নয়ন এবং আত্মনির্ভরশীল রাষ্ট্র গঠনে তাঁর অবদান স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।"
নিরাপত্তার চাদরে রাজধানী ও শেষ বিদায়ের প্রস্তুতি
প্রিয় নেত্রীকে শেষবারের মতো দেখতে দেশের প্রতিটি প্রান্ত থেকে মানুষের ঢল নেমেছে ঢাকার দিকে। এই বিশাল জনস্রোত সামাল দিতে এবং কোনো প্রকার বিশৃঙ্খলা এড়াতে রাজধানীতে গড়ে তোলা হয়েছে নিচ্ছিদ্র নিরাপত্তা বলয়। পুলিশের পাশাপাশি স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে শোকের ছায়া:
বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে জাতিসংঘ, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ভারত, পাকিস্তান ও চীনসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থা গভীর শোক প্রকাশ করেছে । তারা বাংলাদেশের আধুনিক ইতিহাসে তাঁর প্রভাবশালী ভূমিকার কথা শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করেছে।
শেষ ঠিকানা: বীরের পাশে প্রিয়তমা
পারিবারিক ও দলীয় সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, আগামীকাল সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় বেগম খালেদা জিয়ার জানাজা অনুষ্ঠিত হবে। এরপর তাঁকে চন্দ্রিমা উদ্যানে তাঁর প্রিয় স্বামী শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের কবরের পাশেই সমাহিত করা হবে। জীবনের শেষ লগ্নে এসে স্বামী-স্ত্রী আবারও মিলে যাবেন এক চিরস্থায়ী ঠিকানায়।
বেগম খালেদা জিয়া কোনো নাম নয়, তিনি একটি আদর্শের নাম। কারাগারের নির্জন প্রকোষ্ঠে দীর্ঘ সময় অতিবাহিত করলেও তিনি জনগণের অধিকারের প্রশ্নে ছিলেন অনমনীয়। তাঁর এই ‘আপসহীন’ উত্তরাধিকার বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এক বিশাল অনুপ্রেরণা। ইতিহাস হয়তো অনেক রাষ্ট্রনায়কের কথা বলবে, কিন্তু বাংলাদেশের হৃদয়ে এক মহীয়সী গৃহবধূর রাজপথে নেমে এসে দেশনেত্রী হওয়ার এই অসীম সাহসী গল্প চিরকাল অম্লান থাকবে।
বিদায় হে গণতন্ত্রের অতন্দ্র প্রহরী, বিদায় দেশনেত্রী।