শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল, ২০২৬

ট্রাফিক পুলিশের 'টার্গেট' মামলা: শৃঙ্খলা বনাম জনদুর্ভোগ


রাজধানীসহ দেশের বড় শহরগুলোর যানজট ও সড়কে শৃঙ্খলা বজায় রাখতে ট্রাফিক পুলিশের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকলেও সাম্প্রতিক সময়ে ‘টার্গেট’ ভিত্তিক মামলা দেওয়ার অভিযোগে জনঅসন্তোষ বেড়েছে। অভিযোগ রয়েছে, অনেক চালক সামান্য ভুল কিংবা কোনো ভুল ছাড়াই মামলার শিকার হচ্ছেন, বিশেষ করে মোটরসাইকেল ও গণপরিবহনের চালকেরা। এতে পুলিশের প্রতি আস্থাহীনতা তৈরি হচ্ছে এবং অনেক ক্ষেত্রে মামলার জন্য গাড়ি থামানোয় কৃত্রিম যানজট বাড়ছে।

২১ নভেম্বর ২০২৫, ৮:৪৩ অপরাহ্ণ 

ট্রাফিক পুলিশের 'টার্গেট' মামলা: শৃঙ্খলা বনাম জনদুর্ভোগ
  গুগল নিউজে ফলো করে আজকের প্রসঙ্গ এর সাথে থাকুন

রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বড় শহরগুলোর যানজট নিরসনে এবং সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে ট্রাফিক পুলিশের ভূমিকা অপরিহার্য। প্রতিদিন হাজার হাজার যানবাহন ও কোটি মানুষের চলাচল স্বাভাবিক রাখতে তারা নিরলস পরিশ্রম করেন। তবে সাম্প্রতিক সময়ে ট্রাফিক পুলিশের বিরুদ্ধে 'টার্গেট' অনুযায়ী মামলা করার যে অভিযোগ উঠেছে, তা সাধারণ মানুষের মধ্যে গভীর হতাশা এবং ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। এই পরিস্থিতি শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার মহৎ উদ্দেশ্যকে ম্লান করে দিচ্ছে।

উদ্দেশ্য বনাম বাস্তবতা

ট্রাফিক আইন ভঙ্গের দায়ে মামলা ও জরিমানা করার মূল লক্ষ্য হলো চালকদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি করা এবং আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল করে তোলা। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) প্রায় প্রতিদিন হাজার হাজার মামলা দায়ের করে ট্রাফিক ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করছে। এই অভিযানগুলো ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার অংশ হিসেবে চালানো হয় এবং তা অব্যাহত থাকবে বলেও জানানো হয়।

কিন্তু যখন এই মামলা দায়ের একটি নির্দিষ্ট সংখ্যা (টার্গেট) অর্জনে পরিণত হয়, তখন মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত হয়। অনেক সাধারণ চালক অভিযোগ করেন যে, সামান্য ভুল বা ক্ষেত্রবিশেষে কোনো ভুল ছাড়াই তাঁদের মামলার শিকার হতে হচ্ছে। বিশেষ করে মোটরসাইকেল চালক এবং গণপরিবহনের চালকরা এই সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন। তাঁদের মতে, পুলিশ অনেক সময় মানবিক দিক বিবেচনা না করে বা সঠিক কারণ ছাড়া মামলা দিচ্ছে।

আস্থার সংকট ও জনদুর্ভোগ

এই 'টার্গেট' ভিত্তিক মামলা সাধারণ মানুষের মধ্যে পুলিশের প্রতি আস্থাহীনতা তৈরি করছে। যখন একজন সাধারণ নাগরিক মনে করেন যে, আইন প্রয়োগের উদ্দেশ্য শৃঙ্খলা নয় বরং জরিমানা আদায়, তখন পুরো ব্যবস্থার প্রতিই তাঁদের বিরূপ ধারণা তৈরি হয়। এটি আইন মানার মানসিকতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে এবং পুলিশের সাথে জনগণের দূরত্ব বাড়ায়।

এছাড়াও, মামলার জন্য গাড়ি থামানোর ফলে অনেক স্থানে কৃত্রিম যানজটের সৃষ্টি হয়, যা যাত্রীদের দুর্ভোগ আরও বাড়িয়ে তোলে। অনেক সময় জরুরি কাজে বের হওয়া মানুষজন অযথা হয়রানির শিকার হন।

প্রয়োজন নীতিগত পরিবর্তন

এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য ট্রাফিক পুলিশ বিভাগকে অবশ্যই তাদের কার্যপদ্ধতি পুনর্বিবেচনা করতে হবে।

লক্ষ্য হোক শৃঙ্খলা, সংখ্যা নয়: মামলার সংখ্যাকে কর্মদক্ষতার মাপকাঠি না বানিয়ে, বরং সড়ক দুর্ঘটনার হার কমানো এবং যানজট নিরসনকে প্রধান লক্ষ্য হিসেবে নির্ধারণ করতে হবে।

সচেতনতা বৃদ্ধি: আইন প্রয়োগের পাশাপাশি জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম আরও জোরদার করতে হবে।

স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা: মামলা দায়ের এবং জরিমানা আদায়ের প্রক্রিয়ায় সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। ট্রাফিক পুলিশের বিরুদ্ধে ওঠা হয়রানির অভিযোগগুলো দ্রুত তদন্ত করে ব্যবস্থা নিতে হবে।

প্রশিক্ষণ ও মানবিকতা: ট্রাফিক পুলিশ সদস্যদের যথাযথ প্রশিক্ষণ এবং চালকদের সাথে মানবিক আচরণ করার নির্দেশনা দিতে হবে।

সড়কে শৃঙ্খলা ফেরানো একটি সম্মিলিত প্রচেষ্টা। আইন প্রয়োগকারী সংস্থা এবং সাধারণ মানুষ—উভয়ের সহযোগিতাই এখানে জরুরি। ট্রাফিক পুলিশের 'টার্গেট' মামলার পরিবর্তে যদি প্রকৃত শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়, তবেই একটি নিরাপদ এবং জনবান্ধব সড়ক ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব হবে।

 

লেখক: এস এম ফয়েজ 
সিনিয়র সাংবাদিক