শনিবার, ১৮ এপ্রিল, ২০২৬

আইসিজেতে রোহিঙ্গাদের ‘বাঙালি’ বলায় মিয়ানমারের বক্তব্যের তীব্র প্রতিবাদ বাংলাদেশের


আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (আইসিজে) ‘গাম্বিয়া বনাম মিয়ানমার’ মামলায় রোহিঙ্গাদের ‘বাঙালি’ হিসেবে উপস্থাপনের ঘটনায় তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে বাংলাদেশ। ঢাকা বলছে, ২০১৬–১৭ সালের জাতিগত নির্মূল অভিযানকে সন্ত্রাসবাদবিরোধী অভিযান হিসেবে বৈধতা দিতে পরিকল্পিতভাবে রোহিঙ্গাদের জাতিগত পরিচয় বিকৃত করছে মিয়ানমার।

২৪ জানুয়ারী ২০২৬, ১০:২৬ পূর্বাহ্ণ 

আইসিজেতে রোহিঙ্গাদের ‘বাঙালি’ বলায় মিয়ানমারের বক্তব্যের তীব্র প্রতিবাদ বাংলাদেশের
  গুগল নিউজে ফলো করে আজকের প্রসঙ্গ এর সাথে থাকুন

আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (আইসিজে) চলমান ‘গাম্বিয়া বনাম মিয়ানমার’ মামলায় রোহিঙ্গাদের ‘বাঙালি’ হিসেবে অভিহিত করে দেওয়া মিয়ানমারের বক্তব্যের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে বাংলাদেশ। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, ২০১৬–১৭ সালে সংঘটিত জাতিগত নির্মূল অভিযানকে সন্ত্রাসবাদবিরোধী অভিযানের নামে বৈধতা দেওয়া এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টি ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতেই মিয়ানমার সচেতনভাবে রোহিঙ্গাদের জাতিগত পরিচয় বিকৃত করছে।

শুক্রবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে দেওয়া এক বিজ্ঞপ্তিতে এ প্রতিবাদ জানানো হয়। এর আগে বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ এই বিষয়ে আইসিজেতে প্রাথমিক আপত্তি উত্থাপন করে।

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, রোহিঙ্গাদের ‘বাঙালি’ হিসেবে চিত্রায়িত করে মিয়ানমার তাদের ‘অবৈধ অভিবাসী’ ও ‘অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার হুমকি’ হিসেবে প্রমাণ করার চেষ্টা করছে। এর মাধ্যমে তথাকথিত ‘ক্লিয়ারেন্স অপারেশন’ বা শুদ্ধি অভিযানকে সন্ত্রাসবাদবিরোধী পদক্ষেপ হিসেবে বৈধতা দেওয়ার অপচেষ্টা চলছে। বাংলাদেশ এই অবস্থানকে অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধ আড়াল করার কৌশল হিসেবে অভিহিত করেছে।ঐতিহাসিক দলিল, ঔপনিবেশিক জনতাত্ত্বিক বিবরণ এবং স্বতন্ত্র গবেষণায় রাখাইনে রোহিঙ্গাদের উপস্থিতির অকাট্য প্রমাণ রয়েছে। তাই রোহিঙ্গারা বিদেশি বা সাম্প্রতিক অভিবাসী- মিয়ানমারের এমন দাবি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আরও জানিয়েছে, রোহিঙ্গারা একটি স্বতন্ত্র জাতিগত গোষ্ঠী, যারা ১৭৮৫ সালে আরাকান বর্মণ রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার আগেই শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে সেখানে বসবাস করে আসছে। পুরোনো আরাকানের রাজধানী মায়ো-হাউং, ম্রো-হাউং বা রোহাউং-এ তাদের ঐতিহাসিক উপস্থিতির কারণে চট্টগ্রামের রোশাং বা রোহাং এবং বৃহত্তর বাংলায় তাদের পরিচিতি গড়ে ওঠে। ফলে এটি শুরুতে একটি বহির্নামের ব্যবহার ছিল, যা পরবর্তীকালে বিকৃতভাবে প্রয়োগ করা হয়েছে।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় উল্লেখ করেছে, ১৯৮২ সালের বিতর্কিত নাগরিকত্ব আইন জারির আগ পর্যন্ত রোহিঙ্গারা মিয়ানমারের রাজনৈতিক ও সামাজিক জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল। রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিকভাবে দীর্ঘদিন কোণঠাসা করা হলেও তারা ২০১৫ সালের সাধারণ নির্বাচন পর্যন্ত ভোটাধিকার ভোগ করেছে।

বাংলাদেশ বলেছে, রোহিঙ্গাদের পদ্ধতিগতভাবে ‘বাঙালি’ হিসেবে চিহ্নিত করার উদ্দেশ্য হলো তাদের নিজস্ব পরিচয়ের অধিকার অস্বীকার করা এবং জাতিগত নিধনের প্রেক্ষাপট তৈরি করা। যদিও রোহিঙ্গাদের ভাষায় চট্টগ্রাম অঞ্চলের উপভাষার সঙ্গে কিছু মিল রয়েছে, তবে সংস্কৃতি, ইতিহাস ও জাতিগত পরিচয়ের দিক থেকে তারা সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র।

বিজ্ঞপ্তিতে স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়, ১৯৭৮ সালে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে স্বাক্ষরিত দ্বিপক্ষীয় প্রত্যাবাসন চুক্তিতে রোহিঙ্গাদের ‘বার্মার আইনানুগ বাসিন্দা’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছিল। এমনকি ২০১৭–১৮ সালেও নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের বিষয়ে নেপিডো প্রতিশ্রুতি দিলেও গত আট বছরে রাখাইনে অনুকূল পরিবেশ তৈরি করেনি মিয়ানমার। এই দীর্ঘ নিষ্ক্রিয়তা রোহিঙ্গাদের ধ্বংস করার অভিপ্রায় হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে বলে সতর্ক করেছে বাংলাদেশ।

এ ছাড়া ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় প্রায় পাঁচ লাখ বাংলাদেশি রাখাইনে আশ্রয় নিয়েছিল- মিয়ানমারের এমন দাবিকে তথ্য-প্রমাণহীন, বানোয়াট ও ভিত্তিহীন বলে প্রত্যাখ্যান করেছে সরকার।

বাংলাদেশ মিয়ানমার কর্তৃপক্ষকে রোহিঙ্গাদের দেশের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে তাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে।