দেড় ঘণ্টায় তিন ভূমিকম্প, কেঁপেছে বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকা
৬ অক্টোবর ২০২৬, ৯:০০ অপরাহ্ণ
জ লবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব বাংলাদেশের কিশোরীদের জন্য কেবল পরিবেশগত সংকটেই সীমাবদ্ধ নেই; এটি তাদের বেড়ে ওঠা, স্বাস্থ্য ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার ওপরও প্রভাব ফেলছে। বিশেষ করে উপকূলীয় ও দুর্যোগপ্রবণ এলাকার কিশোরীরা বিদ্যমান সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্যের সঙ্গে নতুন করে নানা ঝুঁকির মুখোমুখি হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা প্ল্যান ইন্টারন্যাশনালের বৈশ্বিক প্রতিবেদন ‘চেঞ্জ হার ফোরকাস্ট: হাউ ক্লাইমেট চেঞ্জ ইজ ইমপ্যাক্টিং গার্লস’ সেক্সুয়াল অ্যান্ড রিপ্রোডাক্টিভ হেলথ অ্যান্ড রাইটস’-এ জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে কিশোরীদের যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য এবং অধিকারের সম্পর্ক তুলে ধরা হয়েছে।
বিশ্বের অন্যতম জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশ বাংলাদেশে ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, বন্যা ও নদীভাঙনের প্রভাব মানুষের জীবনযাত্রাকে ক্রমাগত বদলে দিচ্ছে। বিশেষ করে এসব দুর্যোগে ঘরবাড়ি ও জীবিকা হারানো পরিবারগুলোর কিশোরীদের পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।
প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে পরিবারগুলো যখন ঘরবাড়ি ছেড়ে আশ্রয়কেন্দ্র বা অন্য এলাকায় যেতে বাধ্য হয়, তখন কিশোরীদের নিয়মিত পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। নিরাপদ যাতায়াতের অভাব, বিদ্যালয়ের কার্যক্রম বন্ধ থাকা এবং পরিবারের আর্থিক সংকট তাদের শিক্ষাজীবনে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে।
অন্যদিকে, দুর্যোগের পর আয়-রোজগার কমে যাওয়া ও সংসারের ব্যয় বেড়ে যাওয়ার মতো পরিস্থিতিতে কিছু পরিবার মেয়েদের অল্প বয়সে বিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে পারে। ফলে জলবায়ুজনিত সংকট বাল্যবিবাহের বিদ্যমান সামাজিক ও অর্থনৈতিক কারণগুলোকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।
দুর্যোগের সময় স্বাস্থ্যকেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া, চিকিৎসাসেবায় বিঘ্ন এবং যাতায়াতের সমস্যা কিশোরীদের প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার সুযোগ সীমিত করতে পারে। বিশেষ করে মাসিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা, পরিবার পরিকল্পনা, যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্যবিষয়ক তথ্য এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পাওয়ার ক্ষেত্রে বাড়তি বাধা তৈরি হতে পারে।
এ ছাড়া বাস্তুচ্যুতি ও অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রে বসবাসের সময় নিরাপদ পরিবেশের অভাব কিশোরীদের যৌন হয়রানি ও অন্যান্য ধরনের সহিংসতার ঝুঁকিতে ফেলতে পারে। পর্যাপ্ত সুরক্ষা ও সহায়তা না থাকলে এসব পরিস্থিতির নেতিবাচক প্রভাব তাদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যে দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে।
বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকায় লবণাক্ততা, ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বন্যা ও নদীভাঙন মানুষের জীবন-জীবিকায় দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলছে। এসব কারণে অনেক পরিবার বাস্তুচ্যুত হয়ে নতুন এলাকায় বসতি গড়তে বাধ্য হয়।
বাসস্থান পরিবর্তন ও শহরমুখী অভিবাসনের ফলে কিশোরীদের পরিচিত সামাজিক সহায়তা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হতে পারে। নতুন পরিবেশে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং প্রয়োজনীয় সেবা পাওয়ার সুযোগ তৈরি করাও তখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়।
প্ল্যান ইন্টারন্যাশনালের প্রতিবেদনে তুলে ধরা বিষয়গুলো জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় কিশোরীদের বিশেষ চাহিদাকে গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা সামনে এনেছে। কারণ, জলবায়ুজনিত সংকট সবার ওপর সমান প্রভাব ফেলে না; বয়স, লিঙ্গ, আর্থিক অবস্থা ও বসবাসের এলাকার ওপর নির্ভর করে ঝুঁকির ধরনও বদলে যায়।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় শুধু বাঁধ, আশ্রয়কেন্দ্র ও অন্যান্য অবকাঠামো নির্মাণ যথেষ্ট নয়। দুর্যোগের সময় কিশোরীদের শিক্ষা অব্যাহত রাখা, নিরাপদ আশ্রয় নিশ্চিত করা, স্বাস্থ্যসেবা সচল রাখা এবং সহিংসতা প্রতিরোধের ব্যবস্থাও অভিযোজন পরিকল্পনার অংশ হওয়া প্রয়োজন।
এ ক্ষেত্রে স্থানীয় পর্যায়ে কিশোরীবান্ধব স্বাস্থ্যসেবা, জরুরি স্বাস্থ্য ও সুরক্ষা সহায়তা এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ফিরে যাওয়ার সুযোগ নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ, পরিবারকে আর্থিক ও সামাজিক সহায়তা প্রদান এবং দুর্যোগ মোকাবিলায় স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগও প্রয়োজন।
বাংলাদেশের জন্য জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলার নীতিতে কিশোরীদের স্বাস্থ্য, শিক্ষা, নিরাপত্তা ও অধিকারকে গুরুত্ব দেওয়া এখন সময়ের দাবি। দুর্যোগের ক্ষতি কমানোর পাশাপাশি তাদের ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করতে হলে জলবায়ু অভিযোজন ও সামাজিক সুরক্ষা কার্যক্রমকে সমন্বিতভাবে এগিয়ে নেওয়া জরুরি।