চুয়াডাঙ্গায় অভিযানে আটক বিএনপি নেতার মৃত্যু: অভিযানে অংশ নেওয়া সব সেনা সদস্য প্রত্যাহার, তদন্ত কমিটি গঠন
৫ জানুয়ারী ২০২৬, ৯:০০ অপরাহ্ণ
পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়েতে নিয়োগ বাণিজ্য যেন এক অদৃশ্য কিন্তু শক্তিশালী সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে। একের পর এক সংবাদ প্রকাশ, ভুক্তভোগীদের লিখিত অভিযোগ, এমনকি রেল ভবনের ভেতর প্রকাশ্যে ফোনালাপের প্রমাণ মিললেও আজও বহাল রয়েছেন অভিযুক্ত শ্রমিক লীগের প্রচার সম্পাদক ও সরঞ্জাম দপ্তরের অফিস সহকারী মোঃ সত্যব্রত ইসলাম হৃদয়।
অভিযোগ রয়েছে, তিনি আওয়ামী লীগের পোষ্য কোটায় চাকরি পান এবং তার পরিবারের অন্তত ১৫ জন সদস্য বর্তমানে রেলের বিভিন্ন দপ্তরে কর্মরত। শুধু তাই নয়, জুলাই আন্দোলন দমনে সক্রিয় ভূমিকা রেখে হাতে লাঠি নিয়ে মহড়া দেওয়া ও ছাত্র–জনতার ওপর হামলায় অংশ নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এসব ঘটনার একাধিক ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লেও কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
বরং অভিযোগের পর অভিযোগ উঠলেও হৃদয় আজও যুবদলের ছত্রছায়ায় চাকরি বহাল রেখে একাধিক অনিয়মে অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠেছেন—যা রেল প্রশাসনের ভূমিকা নিয়েও গুরুতর প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে।
বরং তদন্ত থামাতে সাংবাদিককে মামলার হুমকি, রাজনৈতিক দলের নাম ব্যবহার করে প্রভাব বিস্তার এবং একাধিক সাবেক রেল কর্মকর্তার ছত্রছায়ায় পুরো সিন্ডিকেট আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে।
তদন্তে নিয়োগ বাণিজ্যের কেন্দ্রবিন্দুতে যাদের নাম উঠে এসেছে— বেলাল উদ্দিন — পশ্চিমাঞ্চল রেলের সাবেক কর্মকর্তা (অভিযোগ: ৫ আগস্টের পর জামায়াতের নাম ভাঙিয়ে প্রভাব বিস্তার), হৃদয় — শ্রমিক লীগের প্রচার সম্পাদক ও রেলের সরঞ্জাম দপ্তরের অফিস সহকারী,
শাহীন (বালতি শাহীন) — যুবদলের নাম ব্যবহারকারী,১৯ নম্বর ওয়ার্ড দক্ষিণের আহ্বায়ক প্রার্থী এই তিনজনের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা সিন্ডিকেট নিয়োগ বাণিজ্যের নামে সাধারণ মানুষের সর্বস্ব লুট করছে বলে অভিযোগ।
নিয়োগ বাণিজ্যের পেছন থেকে কলকাঠি নাড়ছেন পশ্চিমাঞ্চল রেলের সাবেক কর্মকর্তা রাসেদ ইবনে আকবর—এমন অভিযোগ উঠে এসেছে তদন্তে।
আওয়ামী লীগের সঙ্গে যুক্ত থেকে দীর্ঘদিন পশ্চিমাঞ্চল রেলে দায়িত্ব পালনকালে তিনি একাধিক অনিয়ম-দুর্নীতিতে জড়িত ছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
৫ আগস্টের পর এসব বিষয় প্রকাশ পেতে থাকলে তাকে চট্টগ্রামে বদলি করা হয়। কিন্তু অভিযোগ অনুযায়ী—
চট্টগ্রামে বসেই তিনি বেলাল উদ্দিন, হৃদয় ও শাহীনের মাধ্যমে পশ্চিমাঞ্চল রেলের নিয়োগ ও টেন্ডার সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করে যাচ্ছেন।
এমনকি চট্টগ্রামের এসএ কর্পোরেশনকে ঢাকা–রাজশাহী রুটের ট্রেনে আউটসোর্সিং জনবল নিয়োগসহ একাধিক টেন্ডার পাইয়ে দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
ভুক্তভোগী সাব্বির হোসেনের বর্ণনায় উঠে এসেছে ভয়াবহ প্রতারণার চিত্র। তিনি জানিয়েছেন,সাড়ে তিন লাখ টাকার বিনিময়ে রাজশাহীর রেলে অফিস সহকারী পদে চাকরির প্রলোভন দেখানো হয়। প্রথমে দেড় লাখ টাকা নেওয়া হয় নগদ।
পরবর্তীতে নানা অজুহাতে সময়ক্ষেপণ করে তাকে সৈয়দপুরে নিয়ে গিয়ে অফিস সহকারী নয়—দৈনিক লেবার হিসেবে যোগদান করানো হয়, যা তিনি তখন বুঝতে পারেননি।
প্রতারণার বিষয়টি স্পষ্ট হলে চাকরি না নিয়ে ফিরে আসেন ভুক্তভোগী। টাকা ফেরত চাইলে শুরু হয়—
“আজ না কাল”, “সামনের মাস”, “ফাঁকা হলেই হবে”—এই অন্তহীন ঘোরানো।
শেষ পর্যন্ত বোয়ালিয়া থানায় হৃদয় ও শাহীনের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন তিনি।
ভুক্তভোগীর ভাগ্নে আল আমিন জানান, সংবাদ প্রকাশের পরও হৃদয় নিলজ্জের মত হোয়াটসঅ্যাপে মেসেজ দেন — ঢাকা–রাজশাহী ট্রেনের অ্যাটেনডেন্ট হিসেবে কোনো মেয়ে ক্যান্ডিডেট থাকলে ৫০ হাজার টাকা নিয়ে দ্রুত যোগাযোগ করো।
সংবাদ প্রকাশও যে এই সিন্ডিকেটকে থামাতে পারেনি, সেটাই প্রমাণ করে এই কথোপকথন।
রাজশাহীর কর্মরত সংবাদকর্মী ও ভুক্তভোগীরা পশ্চিমাঞ্চল রেলের মহাব্যবস্থাপক ফরিদ আহমেদের দপ্তরে অভিযোগ দিতে গেলে নাটকীয় ঘটনা ঘটে।
হৃদয় বিষয়টি আঁচ করতে পেরে আল আমিনকে ফোন করেন।
জিএম এর সামনেই লাউড স্পিকারে শোনা যায় হৃদয়ের কণ্ঠ— তোমার মামার চাকরির ব্যবস্থা হবে, ওই মেয়ে ক্যান্ডিডেটকে নিয়ে টাকা নিয়ে দ্রুত যোগাযোগ করো।
এই ফোনালাপ শোনার পর মহাব্যবস্থাপক ফরিদ আহমেদ তাৎক্ষণিকভাবে তদন্ত কমিটি গঠনের নির্দেশ দেন।
সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রক দপ্তর জানায়, অভিযোগ সিপিও দপ্তরে পাঠানো হয়েছে। প্রধান সংস্থাপন কর্মকর্তা (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মো. আনোয়ার হোসেন বলেন— দ্রুত তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে।
তবে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে—অভিযোগের পরও কেন অভিযুক্ত হৃদয়ের চাকরি বহাল?
কেন এখনো দৃশ্যমান কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেই?
কার ছত্রছায়ায় এই সিন্ডিকেট এতটা নির্ভীক?
যুবদলের শীর্ষ দুই নেতা স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন—
শিরোইল কলোনির শাহীন যুবদলের কোনো অফিসিয়াল সদস্য নন। কিন্তু স্থানীয়ভাবে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে— তিনি ১৯ নম্বর ওয়ার্ড দক্ষিণ যুবদলের আহ্বায়ক প্রার্থী হিসেবে আবেদন করেছেন।
তাহলে প্রশ্ন— যুবদলের নাম ব্যবহার করে শ্রমিক লীগের নেতাকে রক্ষা করার সাহস তিনি পেলেন কোথা থেকে?
পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের নিয়োগ বাণিজ্য এখন আর বিচ্ছিন্ন অভিযোগ নয়— এটি একটি সংগঠিত, রাজনৈতিক ছত্রছায়াপুষ্ট ও সাবেক–বর্তমান কর্মকর্তাদের আশ্রয়ে গড়ে ওঠা সিন্ডিকেট।
এখন দেখার বিষয়— তদন্ত কি আদৌ হবে, নাকি আগের মতোই ফাইলচাপা পড়ে থাকবে?