রবিবার, ৩০ আগস্ট, ২০২৬

তিন মাস পর খুলছে সুন্দরবন, ফিরছে পর্যটক ও বনজীবীদের প্রাণচাঞ্চল্য


জীববৈচিত্র্য ও মাছসহ বিভিন্ন জলজ প্রাণীর প্রজনন সুরক্ষায় টানা তিন মাস বন্ধ থাকার পর আগামী ১ সেপ্টেম্বর থেকে আবারও খুলে দেওয়া হচ্ছে সুন্দরবন। দীর্ঘ সময় মানুষের আনাগোনা বন্ধ থাকায় বনে বন্যপ্রাণীর অবাধ বিচরণ, খাল-নদীতে মাছের উপস্থিতি এবং উদ্ভিদের ঘনত্ব বেড়েছে বলে জানিয়েছে বন বিভাগ। নিষেধাজ্ঞা শেষে সুন্দরবনে ফিরতে প্রস্তুতি নিচ্ছেন জেলে, মৌয়াল, বাওয়ালি ও পর্যটন-নির্ভর মানুষ।

৩০ আগস্ট ২০২৬, ৯:১৬ অপরাহ্ণ 

তিন মাস পর খুলছে সুন্দরবন, ফিরছে পর্যটক ও বনজীবীদের প্রাণচাঞ্চল্য
  গুগল নিউজে ফলো করে আজকের প্রসঙ্গ এর সাথে থাকুন

জীববৈচিত্র্য ও মাছসহ বিভিন্ন জলজ প্রাণীর প্রজনন সুরক্ষায় টানা তিন মাস বন্ধ থাকার পর আগামী ১ সেপ্টেম্বর থেকে আবারও পর্যটক ও বনজীবীদের জন্য খুলে দেওয়া হচ্ছে সুন্দরবন। জুন, জুলাই ও আগস্ট—এই তিন মাস সুন্দরবনে প্রবেশের পাশাপাশি মাছ, কাঁকড়াসহ সব ধরনের বনজ সম্পদ আহরণে নিষেধাজ্ঞা জারি ছিল।

দীর্ঘ তিন মাস মানুষের আনাগোনা বন্ধ থাকায় সুন্দরবনের প্রাণ-প্রকৃতিতে ফিরেছে নতুন সজীবতা বলে দাবি করেছে বন বিভাগ। এ সময়ে বাঘ, হরিণসহ বিভিন্ন বন্যপ্রাণীর অবাধ বিচরণ বেড়েছে। নদী ও খালে মাছের উপস্থিতিও আগের তুলনায় বেশি দেখা যাচ্ছে। পাশাপাশি সুন্দরী, গেওয়া, কেওড়া, বাইন ও ছইলাসহ বিভিন্ন প্রজাতির উদ্ভিদের ঘনত্বও বেড়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

নিষেধাজ্ঞা শেষে সুন্দরবন খুলে দেওয়ার খবরে স্বস্তি ফিরেছে বনের ওপর নির্ভরশীল জেলে, মৌয়াল, বাওয়ালি এবং পর্যটন-সংশ্লিষ্ট মানুষের মধ্যে। এরই মধ্যে বনে ফেরার প্রস্তুতি শুরু করেছেন উপকূলের বনজীবীরা।

বনজ সম্পদ, জীববৈচিত্র্য এবং বন্য ও জলজ প্রাণীর প্রজনন সুরক্ষায় ১ জুন থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত সুন্দরবনে প্রবেশ ও সব ধরনের বনজ সম্পদ আহরণ বন্ধ রেখেছিল বন বিভাগ। আগামী ১ সেপ্টেম্বর থেকে সেই নিষেধাজ্ঞা শেষ হওয়ায় আবারও বনে প্রবেশ করতে পারবেন পর্যটক, জেলে, বাওয়ালি ও মৌয়ালরা।

অবরোধ চলাকালে সুন্দরবনের বিভিন্ন এলাকায় একাধিকবার রয়েল বেঙ্গল টাইগারের দেখা মিলেছে। কখনো খালের পাড়ে, আবার কখনো বনের গভীরে বাঘের উপস্থিতি নজরে এসেছে। এ ছাড়া হরিণের পাল, বানর, বন্য শূকর ও লাল কাঁকড়ার অবাধ বিচরণও দেখা গেছে বনের বিভিন্ন এলাকায়। জলাশয়ে কুমিরের শিকার ধরার দৃশ্যও নজর কেড়েছে।

বন সংশ্লিষ্টরা বলছেন, টানা তিন মাস মানুষের প্রবেশ বন্ধ থাকায় বন্যপ্রাণীরা নির্ভয়ে চলাচল ও বিচরণের সুযোগ পেয়েছে। একই সময়ে মাছসহ বিভিন্ন জলজ প্রাণীর প্রজননও নির্বিঘ্নে হয়েছে। ফলে সুন্দরবনের বিভিন্ন নদী ও খালে মাছের উপস্থিতি বেড়েছে বলে দাবি তাদের।

তবে এ সময় বন অপরাধের আশঙ্কা থাকায় টহল জোরদার করে বন বিভাগ। জোয়ার-ভাটার সময় বিবেচনায় নিয়ে ২৪ ঘণ্টাই বনের বিভিন্ন এলাকায় পাহারা দিয়েছেন বনকর্মীরা। স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় বাড়ানো হয়েছে স্মার্ট পেট্রোলিংও।

পূর্ব সুন্দরবনের শরণখোলা রেঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষক শরিফুল ইসলাম বলেন, অবরোধ বাস্তবায়নে স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় টহল জোরদার করা হয়েছিল। এ সময়ে বন অপরাধ কমেছে। সুন্দরবনের বিভিন্ন খালে মাছের উপস্থিতি বেড়েছে। হরিণের পালসহ বিভিন্ন বন্যপ্রাণীর বিচরণও বেশি দেখা যাচ্ছে। এমনকি খালের পাড়ে বাঘের উপস্থিতিও পাওয়া গেছে।

বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, স্বাভাবিক সময়ে মাসে সাত দিন স্মার্ট পেট্রোলিং পরিচালনা করা হলেও তিন মাসের নিষেধাজ্ঞার সময় তা বাড়িয়ে ২০ দিন করা হয়। এতে বন অপরাধ নিয়ন্ত্রণে রাখার পাশাপাশি বন্যপ্রাণী ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে বলে মনে করছে বন বিভাগ।

এদিকে দীর্ঘ তিন মাস পর সুন্দরবনে প্রবেশের অপেক্ষায় রয়েছেন উপকূলের জেলেরা। নৌকা ও জাল মেরামত, প্রয়োজনীয় রসদ সংগ্রহসহ প্রায় সব ধরনের প্রস্তুতি শেষ করেছেন তারা। নিষেধাজ্ঞার সময় মাছ ধরা বন্ধ থাকায় এবার খাল ও নদীতে পর্যাপ্ত মাছ পাওয়ার আশা করছেন বনজীবীরা।

শরণখোলার জেলে আলাল মোড়ল বলেন, তিন মাস বনে যেতে পারিনি। নৌকা ও জাল মেরামত করে রেখেছি। এতদিন মাছ ধরা বন্ধ থাকায় এবার বনে গেলে ভালো মাছ পাব-  এমন আশা করছি। মাছ ভালো পাওয়া গেলে আমাদের মতো বনের ওপর নির্ভরশীল পরিবারগুলোর কষ্ট কিছুটা কমবে। শুধু জেলে নয়, সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল মৌয়ালরাও বনে ফেরার অপেক্ষায় রয়েছেন।

শরণখোলার মৌয়াল জীবন কর্মকার বলেন, তিন মাস বনে যেতে না পারায় আমাদের মতো বনজীবী মানুষের সংসারে টানাপোড়েন গেছে। সুন্দরবনই আমাদের জীবিকার প্রধান ভরসা। এখন নিষেধাজ্ঞা শেষ হচ্ছে, তাই আবার বনে গিয়ে মধু ও অন্যান্য বনজ সম্পদ সংগ্রহ করে জীবিকা চালাতে পারব- এটাই আশা। তবে বন থেকে সম্পদ নিতে গিয়ে যেন বনের ক্ষতি না হয়, সেদিকেও আমাদের খেয়াল রাখতে হবে।

বন বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য রক্ষা করতে হলে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য মানুষের প্রবেশ ও বনজ সম্পদ আহরণ বন্ধ রাখা জরুরি। এতে বন্যপ্রাণীর প্রজনন ও বিচরণ নির্বিঘ্ন হওয়ার পাশাপাশি মাছ ও অন্যান্য জলজ প্রাণীর প্রজননও নিশ্চিত হয়।

পূর্ব সুন্দরবন বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন, সুন্দরবনের স্বাভাবিক পরিবেশ ও বন্যপ্রাণীর প্রজনন নিশ্চিত করতে প্রতিবছর নির্দিষ্ট সময়ে নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করা হয়। এ সময় টহলও বাড়ানো হয়। এবারও নিষেধাজ্ঞার সুফল হিসেবে বনে বন্যপ্রাণীর অবাধ বিচরণ এবং খালে মাছের উপস্থিতি বেড়েছে। সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য রক্ষায় এ ধরনের কার্যক্রম অব্যাহত রাখা প্রয়োজন।

সুন্দরবনের পূর্ব ও পশ্চিম বন বিভাগে রয়েছে ১৪টি পর্যটনকেন্দ্র। প্রতিবছর এসব পর্যটনকেন্দ্রে কয়েক লাখ পর্যটক ভ্রমণে আসেন। পাশাপাশি বন বিভাগের কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে বছরের বিভিন্ন সময়ে প্রায় অর্ধলাখ বনজীবী সুন্দরবন থেকে মাছ, গোলপাতা ও মধুসহ বিভিন্ন বনজ সম্পদ আহরণ করেন।

সুন্দরবনের বনজ সম্পদ, জীববৈচিত্র্য ও বন্যপ্রাণীর প্রজনন সুরক্ষায় ২০২১ সাল থেকে প্রতিবছর নির্দিষ্ট সময়ে এই নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করে আসছে বন বিভাগ। এবারের তিন মাসের অবরোধ শেষে বনের প্রাণ-প্রকৃতিতে যে সজীবতা ফিরেছে, তা ধরে রাখতে ভবিষ্যতেও এমন উদ্যোগ অব্যাহত রাখার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।

আগামী ১ সেপ্টেম্বর থেকে সুন্দরবন আবারও উন্মুক্ত হওয়ার মধ্য দিয়ে পর্যটকদের পদচারণার পাশাপাশি শুরু হবে জেলে, মৌয়াল ও বাওয়ালিদের জীবিকার নতুন কর্মযজ্ঞ। তবে বন বিভাগের প্রত্যাশা, জীবিকা ও পর্যটনের প্রয়োজনে সুন্দরবনে প্রবেশ করলেও সবাই নিয়ম মেনে চলবেন এবং বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বনটির জীববৈচিত্র্য রক্ষায় দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখবেন।