শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল, ২০২৬

বিজয়ের মাসের প্রথম দিন


গৌরবময় ডিসেম্বরের প্রথম দিনটি শুধু বিজয়ের মাসের সূচনা নয়, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের চূড়ান্ত সাফল্যের দিকে বাংলাদেশের অগ্রযাত্রার এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। পাকিস্তানি বাহিনীর পরাজয় ঘনিয়ে এলে দেশ-বিদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনেও বদলে যায় যুদ্ধের মোড়, বিশ্ববাসীর সামনে আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে স্বাধীন বাংলাদেশের বাস্তবতা।

১ ডিসেম্বর ২০২৫, ১১:১২ পূর্বাহ্ণ 

বিজয়ের মাসের প্রথম দিন
  গুগল নিউজে ফলো করে আজকের প্রসঙ্গ এর সাথে থাকুন

আজ ১ ডিসেম্বর। শুরু হলো গৌরবের, আত্মত্যাগের, মহাকাব্যের মাস—বিজয়ের মাস। বাংলা জাতির সুদীর্ঘ সংগ্রাম ও রাজনৈতিক ইতিহাসে সর্বশ্রেষ্ঠ অধ্যায় মহান মুক্তিযুদ্ধ। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে বিশ্বের মানচিত্রে প্রতিষ্ঠিত হয় বহু আকাঙ্ক্ষিত স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ। ডিসেম্বর এলেই সেই বিজয়ের গৌরব ও ত্যাগের স্মৃতি নতুন করে ফিরে আসে।

মহান মুক্তিযুদ্ধের ৯ মাসে ৩০ লাখ শহীদের আত্মদান এবং লক্ষাধিক মা-বোনের সম্ভ্রমহানির বিনিময়ে অর্জিত এ বিজয় শুধু ভূখণ্ডের স্বাধীনতা নয়—হাজার বছরের সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বপ্নপূরণের পথও উন্মোচন করে। ডিসেম্বরের প্রতিটি দিন মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে বাঙালির অগ্রযাত্রার সাক্ষী হলেও ১ ডিসেম্বর ছিল বিশেষভাবে ঘটনাবহুল ও তাৎপর্যপূর্ণ।

এদিন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মুক্তিযুদ্ধকে আরও জোরালো সমর্থন দিতে দিল্লিতে রাজ্যসভার অধিবেশনে এক গুরুত্বপূর্ণ বক্তৃতা দেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী। তিনি উপমহাদেশে স্থায়ী শান্তির স্বার্থে অবিলম্বে বাংলাদেশ থেকে পাকিস্তানি সৈন্য প্রত্যাহারের আহ্বান জানান। তার মতে, পাকিস্তানি বাহিনী সরিয়ে নেওয়াই ছিল সমস্যার একমাত্র সমাধান। একইসঙ্গে ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বাংলাদেশ ও ভারতের জনগণকে প্রস্তুত থাকার পরামর্শ দেন তিনি।

একই সময় বিশ্ব মিডিয়াও আরও স্পষ্টভাবে তুলে ধরতে থাকে পাকিস্তানি বাহিনীর দমন-পীড়নের ভয়াবহতা। ১৯৭১ সালের ১ ডিসেম্বর যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক নিউইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে প্রকাশিত হয়—বাংলাদেশের ভেতরে গেরিলা হামলা বেড়ে যাওয়ায় পাকিস্তানি সেনাবাহিনী আরও উন্মত্ত হয়ে নিরীহ মানুষের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, বুড়িগঙ্গার অপর পারে জিঞ্জিরায় একদিনেই সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে ৮৭ জন বাঙালিকে হত্যা করে দখলদার বাহিনী।

এদিকে বাংলাদেশের স্বাধীনতার দাবিকে আড়াল করার অপচেষ্টায় পাক-ভারত যুদ্ধ শুরু হয়েছে বলে বেতার ভাষণে ঘোষণা দেন পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান। কিন্তু তার সেই প্রচারণা বাঙালির ন্যায্য স্বাধীনতার লড়াই থামাতে পারেনি। মুক্তিযোদ্ধাদের অগ্রযাত্রা, আন্তর্জাতিক চাপ এবং পাকিস্তানি বাহিনীর মনোবল ভেঙে পড়া—সব মিলিয়ে ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহেই পরাজয় ছিল নিশ্চিত।

অবশেষে রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের পথ বেয়ে ১৬ ডিসেম্বর রেসকোর্স ময়দানেই আত্মসমর্পণে বাধ্য হয় পাকিস্তানি বাহিনী। বাঙালি জাতি অর্জন করে পরম কাঙ্ক্ষিত বিজয়।

বিজয়ের মাসের প্রথম দিনে তাই বাঙালির শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতা সবটাই নিবেদিত সেই বীর শহীদদের প্রতি, যাদের ত্যাগে আজকের স্বাধীন বাংলাদেশ।