বৃহস্পতিবার, ৮ অক্টোবর, ২০২৬

কম ঘুমে শরীরে যে বড় পরিবর্তন আসে, বাড়তে পারে নানা স্বাস্থ্যঝুঁকি


রাত জাগা, দীর্ঘ কর্মঘণ্টা কিংবা ঘুমের আগে অতিরিক্ত মোবাইল ব্যবহারের কারণে অনেকেরই প্রতিদিনের ঘুম কমে যাচ্ছে। অথচ নিয়মিত অপর্যাপ্ত ঘুম শুধু ক্লান্তি বা দিনের বেলায় ঝিমুনির কারণ নয়; এটি মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা, রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা, ওজন ও বিপাকক্রিয়া, রক্তচাপ, হৃদ্‌স্বাস্থ্য এবং মানসিক সুস্থতার ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে। দীর্ঘদিন ঘুমের ঘাটতি থাকলে এসব ক্ষেত্রে বিভিন্ন স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

৮ অক্টোবর ২০২৬, ১০:১৯ পূর্বাহ্ণ 

কম ঘুমে শরীরে যে বড় পরিবর্তন আসে, বাড়তে পারে নানা স্বাস্থ্যঝুঁকি
  গুগল নিউজে ফলো করে আজকের প্রসঙ্গ এর সাথে থাকুন

ব্যস্ত জীবনযাপন, দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, রাত জাগা কিংবা ঘুমের আগে দীর্ঘ সময় মোবাইল ব্যবহারের কারণে অনেকেরই ঘুমের সময় কমে যাচ্ছে। অথচ পর্যাপ্ত ঘুম শুধু ক্লান্তি দূর করার জন্য নয়; মস্তিষ্ক, হৃদ্‌যন্ত্র, রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা, বিপাকক্রিয়া ও মানসিক স্বাস্থ্যের সঙ্গেও এর গভীর সম্পর্ক রয়েছে। নিয়মিত ঘুমের ঘাটতি হলে শরীরে ধীরে ধীরে নানা পরিবর্তন দেখা দিতে পারে এবং দীর্ঘমেয়াদে বেশ কিছু রোগের ঝুঁকিও বাড়তে পারে।

বর্তমান সময়ে রাত জাগাকে অনেকেই স্বাভাবিক জীবনযাপনের অংশ হিসেবে দেখেন। কেউ কাজের চাপে, কেউ পড়াশোনা বা ক্যারিয়ারের কারণে, আবার কেউ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিনোদনের পেছনে অতিরিক্ত সময় দেওয়ার কারণে নির্ধারিত সময়ের চেয়ে কম ঘুমান। বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রাপ্তবয়স্কদের সাধারণত প্রতি রাতে অন্তত ৭ ঘণ্টা ঘুম প্রয়োজন। তবে বয়স, শারীরিক অবস্থা ও ব্যক্তিভেদে ঘুমের প্রয়োজনীয়তা কিছুটা ভিন্ন হতে পারে। শুধু কত ঘণ্টা ঘুমানো হচ্ছে তা নয়, ঘুম কতটা নিয়মিত ও মানসম্মত- সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।

মস্তিষ্কের কর্মক্ষমতায় প্রভাব

ঘুমের সময় মস্তিষ্ক দিনের বিভিন্ন তথ্য প্রক্রিয়াজাত ও স্মৃতি সংরক্ষণের গুরুত্বপূর্ণ কাজ করে। ঘুমের ঘাটতি হলে মনোযোগ ধরে রাখা, নতুন তথ্য শেখা, স্মৃতি মনে করা এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতায় সাময়িক সমস্যা দেখা দিতে পারে। একটানা কয়েক রাত কম ঘুম হলে দিনের বেলায় অতিরিক্ত ঝিমুনি, ভুল করার প্রবণতা এবং প্রতিক্রিয়া জানানোর সময় বেড়ে যেতে পারে। ফলে গাড়ি চালানো বা যন্ত্রপাতি ব্যবহারের সময় দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বাড়ে।

দীর্ঘদিনের ঘুমের সমস্যা মস্তিষ্কের স্বাস্থ্যের ওপর কীভাবে প্রভাব ফেলে, তা নিয়ে গবেষণা চলছে। তাই কম ঘুমকে সরাসরি আলঝেইমার বা ডিমেনশিয়ার কারণ হিসেবে না দেখে এসব রোগের সঙ্গে ঘুমের ঘাটতির সম্ভাব্য সম্পর্ক হিসেবে দেখা বেশি যুক্তিযুক্ত।

দুর্বল হতে পারে রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা

ঘুমের সঙ্গে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থারও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। পর্যাপ্ত ঘুম না হলে রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হতে পারে। ফলে কিছু সংক্রমণের বিরুদ্ধে শরীরের প্রতিরোধক্ষমতা কমে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। বিশেষ করে নিয়মিত কম ঘুমানো ব্যক্তিদের সাধারণ সর্দি-কাশিসহ কিছু সংক্রমণে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি হতে পারে। অসুস্থ হওয়ার পর সুস্থ হয়ে উঠতেও পর্যাপ্ত বিশ্রাম গুরুত্বপূর্ণ।

বাড়তে পারে ক্ষুধা ও ওজন

ঘুমের ঘাটতি ক্ষুধা ও খাবারের প্রতি আকর্ষণের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। পর্যাপ্ত ঘুম না হলে বেশি ক্যালরিযুক্ত খাবারের প্রতি আকাঙ্ক্ষা বাড়তে পারে এবং খাবারের পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

এ ছাড়া ঘুমের ঘাটতি শরীরের বিপাকক্রিয়া ও রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে পর্যাপ্ত ঘুমের অভাব ওজন বৃদ্ধি এবং টাইপ-২ ডায়াবেটিসের মতো বিপাকীয় সমস্যার ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত বলে বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে। তবে শুধু কম ঘুমালেই যে কারও ওজন বেড়ে যাবে- বিষয়টি এত সরল নয়। খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক পরিশ্রম, বয়স, জেনেটিক বৈশিষ্ট্যসহ আরও অনেক বিষয় এতে ভূমিকা রাখে।

হৃদ্‌যন্ত্র ও রক্তচাপের ওপর চাপ

ঘুমের সময় শরীর বিশ্রাম নেওয়ার পাশাপাশি হৃদ্‌যন্ত্র ও রক্তনালিও পুনরুদ্ধারের সুযোগ পায়। নিয়মিত পর্যাপ্ত ঘুম না হলে রক্তচাপ ও শরীরের স্ট্রেস-সম্পর্কিত প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন দেখা দিতে পারে।

দীর্ঘমেয়াদে অপর্যাপ্ত ঘুম উচ্চ রক্তচাপ, হৃদ্‌রোগ ও স্ট্রোকের বাড়তি ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত। বিশেষ করে যাদের আগে থেকেই উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস বা হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি রয়েছে, তাদের জন্য নিয়মিত ঘুমের গুরুত্ব আরও বেশি।

মেজাজ খিটখিটে হয়ে উঠতে পারে

এক রাত ভালোভাবে না ঘুমালেও পরদিন মেজাজ খারাপ, বিরক্তি বা মনোযোগের ঘাটতি দেখা দিতে পারে। নিয়মিত ঘুমের সমস্যা থাকলে উদ্বেগ, মানসিক চাপ ও বিষণ্ণতার উপসর্গ আরও তীব্র হতে পারে। এখানে সম্পর্কটি দুই দিকের। মানসিক চাপ বা বিষণ্ণতা যেমন ঘুমের সমস্যা তৈরি করতে পারে, তেমনি দীর্ঘদিনের ঘুমের সমস্যাও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

হরমোন ও রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণেও প্রভাব

ঘুম শরীরের বিভিন্ন হরমোন ও বিপাকীয় প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ঘুমের ঘাটতি হলে ইনসুলিনের কার্যকারিতা কমে যেতে পারে এবং রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে সমস্যা হওয়ার আশঙ্কা বাড়তে পারে। এ ছাড়া ক্ষুধা ও তৃপ্তির সঙ্গে সম্পর্কিত হরমোনের ভারসাম্যেও পরিবর্তন ঘটতে পারে। এর ফলে ক্ষুধা বেড়ে যাওয়া এবং অতিরিক্ত খাবার গ্রহণের প্রবণতা তৈরি হতে পারে।

শরীরের পুনরুদ্ধার বাধাগ্রস্ত হয়

ঘুম শুধু মস্তিষ্কের বিশ্রামের সময় নয়। এ সময় শরীরের বিভিন্ন টিস্যু ও অঙ্গপ্রত্যঙ্গ পুনরুদ্ধারের প্রক্রিয়া চলে। পর্যাপ্ত ঘুম না হলে শারীরিক কর্মক্ষমতা, ব্যায়ামের পর পুনরুদ্ধার এবং দিনের সামগ্রিক শক্তির ওপর প্রভাব পড়তে পারে।

যারা নিয়মিত শরীরচর্চা করেন, তাদের জন্যও ঘুম গুরুত্বপূর্ণ। পর্যাপ্ত বিশ্রাম ছাড়া শরীরকে নিয়মিত উচ্চমাত্রার শারীরিক পরিশ্রমের মধ্যে রাখলে ক্লান্তি ও কর্মক্ষমতা কমে যাওয়ার সমস্যা দেখা দিতে পারে।

শুধু দীর্ঘ ঘুম নয়, নিয়মিত ঘুমও গুরুত্বপূর্ণ

অনেকে কর্মদিবসে কম ঘুমিয়ে ছুটির দিনে বেশি ঘুমিয়ে ঘাটতি পূরণের চেষ্টা করেন। এতে কিছুটা উপকার মিললেও প্রতিদিনের ঘুমের ঘাটতি পুরোপুরি পুষিয়ে নেওয়া সবসময় সম্ভব নয়। তাই প্রতিদিন প্রায় একই সময়ে ঘুমানো ও জাগার অভ্যাস তৈরি করা বেশি কার্যকর।

বিশেষজ্ঞরা ঘুমের আগে ক্যাফেইন গ্রহণ কমানো, রাতে অতিরিক্ত আলো ও স্ক্রিনের ব্যবহার সীমিত করা এবং ঘুমের উপযোগী শান্ত ও অন্ধকার পরিবেশ তৈরির পরামর্শ দেন। নিয়মিত শারীরিক ব্যায়ামও ভালো ঘুমে সহায়তা করতে পারে।

কখন চিকিৎসকের পরামর্শ প্রয়োজন?

শুধু ব্যস্ততার কারণে এক-দুই রাত কম ঘুম হওয়া সাধারণত বড় সমস্যা নয়। তবে দীর্ঘদিন ধরে ঘুমাতে সমস্যা হওয়া, রাতে বারবার জেগে ওঠা, খুব জোরে নাক ডাকা, ঘুমের মধ্যে শ্বাস বন্ধ হয়ে আসা কিংবা পর্যাপ্ত সময় ঘুমানোর পরও দিনের বেলায় অতিরিক্ত ঘুম ঘুম ভাব থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। কারণ এসব লক্ষণ অনিদ্রা, স্লিপ অ্যাপনিয়াসহ বিভিন্ন ঘুমের সমস্যার ইঙ্গিত হতে পারে।

ঘুমকে তাই সময়ের অপচয় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। কর্মব্যস্ততার কারণে নিয়মিত ঘুম কমিয়ে দিলে হয়তো সাময়িকভাবে কিছু অতিরিক্ত সময় পাওয়া যায়, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে তার মূল্য দিতে হতে পারে স্বাস্থ্য ও কর্মক্ষমতার মাধ্যমে। সুস্থ থাকতে খাবার ও ব্যায়ামের পাশাপাশি পর্যাপ্ত ও নিয়মিত ঘুমকেও দৈনন্দিন জীবনের অপরিহার্য অংশ হিসেবে গুরুত্ব দেওয়া জরুরি।