বুধবার, ৩ জুন, ২০২৬

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি নির্বাচিত ড. খলিলুর রহমান: ৬ দফা কর্মপরিকল্পনা ঘোষণা


জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের (ইউএনজিএ) ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি হিসেবে ঐতিহাসিক বিজয় লাভ করেছেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান। মঙ্গলবার (২ জুন) জাতিসংঘ সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত এক প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ গোপন ব্যালট ভোটে তিনি সাইপ্রাসের বিশেষ দূত আন্দ্রেয়াস কাকৌরিসকে পরাজিত করেন। নির্বাচিত হওয়ার পর নিজের প্রথম আনুষ্ঠানিক বক্তব্যে বিশ্বব্যাপী শান্তি রক্ষা, টেকসই উন্নয়ন (এসডিজি) অর্জন, মানবাধিকার পরিস্থিতি উন্নয়ন এবং বহুপাক্ষিক সহযোগিতা জোরদারে একটি সুনির্দিষ্ট ছয় দফা কর্মপরিকল্পনা তুলে ধরেছেন তিনি।

৩ জুন ২০২৬, ১০:৩১ পূর্বাহ্ণ 

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি নির্বাচিত ড. খলিলুর রহমান: ৬ দফা কর্মপরিকল্পনা ঘোষণা
  গুগল নিউজে ফলো করে আজকের প্রসঙ্গ এর সাথে থাকুন

বৈশ্বিক কূটনীতিতে বাংলাদেশের এক ঐতিহাসিক গৌরবগাথা রচিত হলো। জাতিসংঘের ১৯৩টি সদস্য রাষ্ট্রের উপস্থিতিতে সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি পদের জন্য এক অত্যন্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। নির্বাচনে মোট ১৯০টি ভোটের মধ্যে বাংলাদেশের প্রার্থী ও বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান ৯৯টি দেশের সমর্থন পেয়ে বিজয়ী হন। অন্যদিকে তাঁর একমাত্র প্রতিদ্বন্দ্বী সাইপ্রাসের বিশেষ দূত আন্দ্রেয়াস এস কাকৌরিস লাভ করেন ৯১টি ভোট।

আগামী সেপ্টেম্বর মাসে এই মর্যাদাপূর্ণ বৈশ্বিক ফোরামের ৮১তম অধিবেশন আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হলে এক বছরের জন্য সভাপতির দায়িত্ব গ্রহণ করবেন বাংলাদেশের এই বর্ষীয়ান কূটনীতিক।

বিজয় নিশ্চিত হওয়ার পর জাতিসংঘ সদর দপ্তরে দেওয়া প্রথম আনুষ্ঠানিক বক্তব্যে ড. খলিলুর রহমান বিশ্বনেতাদের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, সদস্য দেশগুলোর আস্থা ও সমর্থনের কারণেই এই গুরুত্বপূর্ণ বৈশ্বিক দায়িত্ব পালনের সুযোগ তৈরি হয়েছে। এই মর্যাদাপূর্ণ আসনটি তিনি গভীর বিনয় ও দায়িত্ববোধের সঙ্গে গ্রহণ করছেন।

বক্তব্যের শুরুতে তাঁকে এই পদের জন্য মনোনয়ন প্রদান করায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রতি বিশেষ ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী। একই সঙ্গে এই দীর্ঘ নির্বাচনি প্রচারণায় অক্লান্ত পরিশ্রম ও সহযোগিতা করার জন্য বাংলাদেশের জনগণ, তাঁর কূটনৈতিক টিম এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনের শুভানুধ্যায়ীদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান। এছাড়া প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী আন্দ্রেয়াস কাকৌরিসের প্রশংসা করে তিনি বলেন, কাকৌরিস অত্যন্ত ইতিবাচক ও গঠনমূলক প্রচার পরিচালনা করেছেন, যা ভবিষ্যতের জন্য একটি চমৎকার ও অনুসরণযোগ্য দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।

ইউএনজিএর নবনির্বাচিত সভাপতি তাঁর বক্তব্যে বর্তমান বিশ্বের এক জটিল ও সংকটাপন্ন পরিস্থিতি স্মরণ করিয়ে দেন। তিনি উল্লেখ করেন, জাতিসংঘ বর্তমানে এমন এক সময়ে প্রবেশ করছে যখন বিশ্বব্যাপী ভূ-রাজনৈতিক সংঘাত, তীব্র মানবিক সংকট, উন্নয়নগত স্থবিরতা এবং মানবাধিকার পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটছে। এসব বিষয় বিশ্ববাসীর কাছে জাতিসংঘের কার্যকারিতা ও গ্রহণযোগ্যতাকে বড় ধরনের প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। এর পাশাপাশি চলমান আর্থিক সংকটও জাতিসংঘের নিয়মিত কার্যক্রম পরিচালনায় নতুন করে চাপ সৃষ্টি করছে।

এসব বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সদস্য রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করার দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন ড. খলিলুর রহমান। তিনি তাঁর সভাপতি মেয়াদে ৬টি মূল স্তম্ভ বা কর্মপরিকল্পনাকে অগ্রাধিকার দেবেন:

১. শান্তি ও নিরাপত্তা: বৈশ্বিক সংঘাত প্রতিরোধ, রাজনৈতিক সমাধান ও বেসামরিক জনগণের সুরক্ষা।

২. ২০৩০ এজেন্ডা (এসডিজি): পিছিয়ে থাকা টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সমন্বিত প্রচেষ্টা জোরদার করা। 

৩. জলবায়ু পরিবর্তন: জলবায়ু অ্যাকশন ও পরিবেশগত সুরক্ষা নিশ্চিতকরণ। 

৪. মানবাধিকার: বিশ্বব্যাপী মানবাধিকার পরিস্থিতির উন্নয়ন ও সুরক্ষা। 

৫. উদীয়মান প্রযুক্তি: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) সহ নতুন প্রযুক্তির সঠিক শাসন ও রূপান্তর ব্যবস্থাপনা। 

৬. জাতিসংঘ সংস্কার: বর্তমান সময়ের উপযোগী করে জাতিসংঘের প্রাতিষ্ঠানিক ও আর্থিক সংস্কার সাধন।

বক্তব্যে ড. খলিলুর রহমান আন্তর্জাতিক শান্তি প্রতিষ্ঠায় বাংলাদেশের গৌরবময় ভূমিকার কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, সাইপ্রাস থেকে শুরু করে সুদান পর্যন্ত বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের মিশনে বাংলাদেশের শান্তিরক্ষীরা অত্যন্ত নিষ্ঠা ও অভিজ্ঞতার সঙ্গে অবদান রেখে আসছেন। এই অভিজ্ঞতার আলোকেই তিনি সংঘাত প্রতিরোধ, বেসামরিক সুরক্ষা এবং আরও কার্যকর-সমন্বিত শান্তিরক্ষা কাঠামো গড়ে তোলার ওপর জোর দেন। একই সঙ্গে বিশ্ব শান্তিরক্ষায় নারীদের অর্থবহ অংশগ্রহণ বৃদ্ধির জন্য জোরালো আহ্বান জানান।

টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ২০৩০ এজেন্ডার লক্ষ্য অর্জনে এখনো বড় ধরনের বিশ্বব্যাপী ঘাটতি রয়ে গেছে। ২০২৭ সালে অনুষ্ঠেয় এসডিজি সম্মেলনকে সামনে রেখে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে সমন্বিত উদ্যোগে পিছিয়ে পড়া লক্ষ্যগুলো পূরণে কাজ করার প্রতিশ্রুতি দেন তিনি। এ ছাড়া এসডিজি অর্থায়ন, ঋণ ব্যবস্থাপনার স্থায়িত্ব, আন্তর্জাতিক আর্থিক কাঠামোর সংস্কার এবং স্বল্পোন্নত দেশগুলোর উন্নয়নের জন্য গৃহীত 'দোহা কর্মসূচি'র সফল বাস্তবায়নে বিশেষ নজর দেওয়ার কথা জানান ইউএনজিএর নবনির্বাচিত এই সভাপতি।