আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মিথিলা • নিউইয়র্কে গবেষণা ও শিক্ষকতায় মিথিলা
৫ অক্টোবর ২০২৬, ৯:৫৪ পূর্বাহ্ণ
শিক্ষা শুধু জ্ঞান অর্জনের মাধ্যম নয়, বরং একটি মানবিক, সচেতন ও মূল্যবোধসম্পন্ন সমাজ গঠনের ভিত্তি। আর সেই ভিত্তি নির্মাণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন শিক্ষকরা। শিক্ষার্থীদের পাঠ্যবইয়ের জ্ঞান দেওয়ার পাশাপাশি তাঁদের নৈতিকতা, চিন্তাশক্তি, দায়িত্ববোধ ও মানবিক গুণাবলি বিকাশেও শিক্ষকদের অবদান গুরুত্বপূর্ণ। তবে শিক্ষার মানোন্নয়ন এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে দক্ষ নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে শিক্ষকদের যথাযথ সম্মান, পেশাগত স্বাধীনতা ও নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে এবারের বিশ্ব শিক্ষক দিবসে।
১৯৯৪ সালে ইউনেসকো ৫ অক্টোবরকে বিশ্ব শিক্ষক দিবস হিসেবে ঘোষণা করে। পরের বছর, অর্থাৎ ১৯৯৫ সাল থেকে দিনটি আন্তর্জাতিকভাবে পালিত হয়ে আসছে। শিক্ষকদের অবদানকে স্বীকৃতি দেওয়া, তাঁদের অধিকার সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানো এবং শিক্ষা ব্যবস্থায় তাঁদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা তুলে ধরাই দিবসটির মূল লক্ষ্য।
এবারের প্রতিপাদ্য-‘শিক্ষকদের পাশে দাঁড়ানো: পেশার সুরক্ষা, মর্যাদা উন্নয়ন ও আমাদের ভবিষ্যৎ গঠন’। প্রতিপাদ্যে শিক্ষকদের পেশাগত সুরক্ষা ও মর্যাদা নিশ্চিত করার পাশাপাশি ভবিষ্যৎ প্রজন্ম গঠনে তাঁদের ভূমিকার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশে ২০২৩ সালের ৫ অক্টোবর প্রথমবারের মতো জাতীয় পর্যায়ে বিশ্ব শিক্ষক দিবস উদযাপন করা হয়। এরপর থেকে প্রতিবছর সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে দিবসটি পালন করা হচ্ছে।
বিশ্ব শিক্ষক দিবস উপলক্ষে এবার বিভিন্ন পর্যায়ের ১০১ জন গুণী শিক্ষককে বিশেষ সম্মাননা দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। শিক্ষাক্ষেত্রে অবদান এবং জাতি গঠনে ভূমিকার স্বীকৃতি হিসেবে তাঁদের এ সম্মাননা দেওয়া হবে।
সোমবার রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে আয়োজিত অনুষ্ঠানে শিক্ষকদের হাতে সম্মাননা তুলে দেওয়ার কথা রয়েছে। প্রত্যেক সম্মাননাপ্রাপ্ত শিক্ষককে দুই লাখ টাকা, একটি ক্রেস্ট ও সম্মাননাপত্র দেওয়া হবে।
সরকারের নির্ধারিত পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রাথমিক পর্যায়ে ১০ জন, মাধ্যমিক পর্যায়ে ২০ জন, কলেজ পর্যায়ে ২৫ জন এবং সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে ২০ জন শিক্ষক সম্মাননা পাবেন। এ ছাড়া চিকিৎসা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ১০ জন, কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনজন, প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনজন এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়সহ অন্যান্য বিশেষায়িত বিশ্ববিদ্যালয়ে চারজন শিক্ষককে সম্মাননা দেওয়া হবে। প্রধানমন্ত্রীর নির্বাচিত আরও ছয়জন শিক্ষক এ তালিকায় রয়েছেন।
প্রাথমিক পর্যায়ের সম্মাননার মধ্যে সাধারণ বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের জন্য আটটি এবং মাদ্রাসার শিক্ষকদের জন্য দুটি রাখা হয়েছে। মাধ্যমিক পর্যায়ে সাধারণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে ১০ জন, কারিগরি শিক্ষা থেকে পাঁচজন এবং মাদ্রাসা থেকে পাঁচজন শিক্ষক নির্বাচিত হয়েছেন। কলেজ পর্যায়ে সাধারণ শিক্ষার ১৫ জন, কারিগরি শিক্ষার পাঁচজন এবং মাদ্রাসার পাঁচজন শিক্ষক সম্মাননা পাবেন। সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৮ জন এবং বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের দুজন শিক্ষককে নির্বাচন করা হয়েছে।
চিকিৎসা শিক্ষায় মেডিক্যাল কলেজ ও চিকিৎসা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাঁচজন করে শিক্ষক সম্মাননা পাবেন। পাশাপাশি কৃষি, প্রকৌশল, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি এবং অন্যান্য বিশেষায়িত বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদেরও স্বীকৃতি দেওয়া হবে।
সম্মাননার জন্য যোগ্য শিক্ষক বাছাইয়ে একাধিক পর্যায়ে যাচাই-বাছাইয়ের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। প্রাথমিক, মাধ্যমিক, কলেজ, মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের নির্বাচন করতে সংশ্লিষ্ট শিক্ষা অধিদপ্তরের মাধ্যমে সার্চ কমিটি গঠন করা হয়।
এসব কমিটি প্রতিটি ক্যাটাগরিতে তিনজন যোগ্য শিক্ষকের নাম প্রস্তাব করে জাতীয় স্টিয়ারিং কমিটির কাছে পাঠায়। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়েও বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) গঠিত সার্চ কমিটি একইভাবে সম্ভাব্য শিক্ষকদের প্যানেল প্রস্তুত করে। পরবর্তী সময়ে এসব প্রস্তাব পর্যালোচনা করে চূড়ান্তভাবে সম্মাননাপ্রাপ্ত শিক্ষকদের নির্বাচন করা হয়। এ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বিভিন্ন পর্যায়ের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অবদান রাখা শিক্ষকদের স্বীকৃতি দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী জানিয়েছেন, শিক্ষকদের কল্যাণে সরকারের পরিকল্পনা শুধু বিশ্ব শিক্ষক দিবসের আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। সারা বছর শিক্ষকদের কল্যাণে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার বিষয়েও কাজ চলছে।
শিক্ষাবিদদের মতে, একটি দেশের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন অনেকাংশে নির্ভর করে তার শিক্ষা ব্যবস্থার ওপর। আর সেই ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে শিক্ষকদের দক্ষতা, পেশাগত স্বাধীনতা ও কাজের পরিবেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
তাঁদের মতে, শিক্ষকরা যদি আর্থিক ও সামাজিক নিরাপত্তা পান এবং সম্মানজনক পরিবেশে দায়িত্ব পালন করতে পারেন, তাহলে শিক্ষার্থীদের পাঠদান ও সার্বিক বিকাশেও ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। একই সঙ্গে আধুনিক জ্ঞান, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মিলিয়ে শিক্ষার্থীদের প্রস্তুত করতেও শিক্ষকদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা জরুরি।
বিশ্ব শিক্ষক দিবস তাই কেবল শিক্ষকদের অবদানের প্রশংসা করার উপলক্ষ নয়; বরং তাঁদের অধিকার, মর্যাদা ও পেশাগত সুরক্ষা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করার দিন।
দিবসটি উপলক্ষে জাতীয়, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে বিভিন্ন কর্মসূচি পালনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দেশের বিদ্যালয়, কলেজ, মাদ্রাসা, কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং বিভিন্ন ধরনের বিশ্ববিদ্যালয়ে আলোচনা সভা, র্যালি ও সম্মাননা প্রদানসহ নানা আয়োজন থাকবে।
শিক্ষকদের অবদানকে যথাযথ স্বীকৃতি দেওয়া এবং তাঁদের সামাজিক মর্যাদা আরও সুসংহত করার পাশাপাশি শিক্ষার গুণগত মান বাড়ানোর অঙ্গীকারও উঠে আসবে এবারের আয়োজনে। শিক্ষকদের জন্য সম্মানজনক কর্মপরিবেশ, পেশাগত নিরাপত্তা ও প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা গেলে তার সুফল শুধু শিক্ষকদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং তা দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম ও সামগ্রিক উন্নয়নেও ভূমিকা রাখবে।