সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

অপ্রতিমের মৃত্যুতে শিশু নিরাপত্তা নিয়ে নতুন উদ্বেগ, দ্রুত তদন্তের দাবি


কুমিল্লায় ১৩ বছর বয়সী ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিমের হত্যাকাণ্ড আবারও দেশে শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ সামনে এনেছে। অপ্রতিম নিখোঁজ হওয়ার পর লালমাই পাহাড়ের একটি নির্জন এলাকা থেকে তার মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত এবং জড়িতদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছে ২৬টি জাতীয় এনজিওর সমন্বয়ে গঠিত শিশু যৌন নির্যাতন প্রতিরোধ (সিএসএ প্রিভেনশন) নেটওয়ার্ক।

২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৭:৫৯ অপরাহ্ণ 

অপ্রতিমের মৃত্যুতে শিশু নিরাপত্তা নিয়ে নতুন উদ্বেগ, দ্রুত তদন্তের দাবি
  গুগল নিউজে ফলো করে আজকের প্রসঙ্গ এর সাথে থাকুন

১৩ বছর বয়সী ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিমের মর্মান্তিক মৃত্যু আবারও বাংলাদেশের শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ সামনে এনেছে। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষকের সন্তান অপ্রতিম নিখোঁজ হওয়ার পর লালমাই পাহাড়ের একটি নির্জন এলাকা থেকে তার মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত এবং জড়িতদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছে ২৬টি জাতীয় এনজিওর সমন্বয়ে গঠিত শিশু যৌন নির্যাতন প্রতিরোধ (সিএসএ প্রিভেনশন) নেটওয়ার্ক।
শিশুদের নিরাপত্তাকে শুধু একটি নির্দিষ্ট হত্যাকাণ্ডের বিচার দিয়ে নয়, বরং নিখোঁজ হওয়া থেকে শুরু করে উদ্ধার, তদন্ত এবং পরবর্তী সুরক্ষা—পুরো ব্যবস্থার অংশ হিসেবে দেখার আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনটি।
শুক্রবার (১৮ সেপ্টেম্বর) কুমিল্লার কোটবাড়ি এলাকার বাসা থেকে বের হওয়ার পর অপ্রতিম নিখোঁজ হয়। পরদিন কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়সংলগ্ন লালমাই পাহাড়ের সানন্দা এলাকার জঙ্গল থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পুলিশ এ ঘটনায় চারজনকে গ্রেপ্তার করেছে বলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছেন। তবে তদন্ত শেষ হওয়ার আগে কাউকে চূড়ান্তভাবে অপরাধী হিসেবে বিবেচনা না করার কথাও জানিয়েছে শিশু অধিকার নেটওয়ার্ক।

একটি ঘটনা, বড় একটি প্রশ্ন
অপ্রতিমের মৃত্যু নিয়ে শোকের পাশাপাশি শিশুদের নিরাপত্তা ব্যবস্থা কতটা কার্যকর- সে প্রশ্নও সামনে এসেছে। নেটওয়ার্কটি বলছে, কোনো শিশু নিখোঁজ হওয়ার পর প্রথম কয়েক ঘণ্টা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই থানায় সাধারণ ডায়েরি বা মামলা গ্রহণের সঙ্গে সঙ্গে অনুসন্ধান ও উদ্ধার কার্যক্রম শুরু এবং সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে দ্রুত তথ্য আদান-প্রদান নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
বিশেষ করে শিশুদের চলাচলের স্থান, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, পার্ক, পাহাড়ি ও নির্জন এলাকা এবং আবাসিক এলাকায় পর্যাপ্ত আলোকসজ্জা, সিসিটিভি ও জরুরি সহায়তার ব্যবস্থা জোরদারের দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি।

সাত মাসে নিখোঁজ ১৫ হাজারের বেশি শিশু
শিশু নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের মধ্যে পুলিশ সদর দপ্তরের সাম্প্রতিক পরিসংখ্যানও আলোচনায় এসেছে। ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত দেশে ১৫ হাজার ৭১৭ শিশুর নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় সাধারণ ডায়েরি করা হয়েছে। এর মধ্যে ১৩ হাজার ৬৭৯ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে বা তারা পরিবারের কাছে ফিরে এসেছে। এখনো ২ হাজার ৩৮ জনের সন্ধান পাওয়া যায়নি।
নেটওয়ার্ক বলছে, এই পরিসংখ্যান শিশু নিখোঁজের প্রতিটি ঘটনায় দ্রুত ও সমন্বিত প্রতিক্রিয়ার প্রয়োজনীয়তা সামনে আনে।

শিশুদের বিরুদ্ধে সহিংসতার চিত্রও উদ্বেগজনক
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) জানুয়ারি থেকে আগস্ট ২০২৬-এর পত্রিকাভিত্তিক তথ্য উদ্ধৃত করে নেটওয়ার্ক জানিয়েছে, এ সময়ে ৭০৯ শিশু বিভিন্ন ধরনের সহিংসতার শিকার হয়েছে। এর মধ্যে ধর্ষণ, ধর্ষণের চেষ্টা, শারীরিক নির্যাতন, যৌন হয়রানি, অপহরণ ও নিখোঁজের মতো ঘটনা রয়েছে।
শিশু অধিকারকর্মীদের মতে, এসব ঘটনা বিচ্ছিন্নভাবে দেখলে সমস্যার গভীরতা বোঝা কঠিন। পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, স্থানীয় প্রশাসন এবং শিশু সুরক্ষা সংগঠনগুলোর মধ্যে কার্যকর সমন্বয় ছাড়া শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কঠিন।

তদন্তে প্রযুক্তি ও ফরেনসিক সক্ষমতা বাড়ানোর দাবি
অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের তদন্তে ঘটনাস্থল ও আশপাশের সিসিটিভি ফুটেজ, মোবাইল ফোন ও অন্যান্য ডিজিটাল তথ্য এবং ফরেনসিক আলামত যথাযথভাবে সংগ্রহ ও বিশ্লেষণের দাবি জানিয়েছে সিএসএ নেটওয়ার্ক।
তাদের মতে, তদন্তের প্রতিটি ধাপে প্রমাণ সংরক্ষণ ও বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে পেশাদারিত্ব নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে যাদের বিরুদ্ধে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যাবে, তাদের প্রচলিত আইনে বিচারের মুখোমুখি করার আহ্বান জানানো হয়েছে।

আইনের প্রয়োগ ও পুলিশের প্রশিক্ষণের ওপর জোর
শিশু নিখোঁজ, নির্যাতন ও সহিংসতার ঘটনায় দায়িত্বপ্রাপ্ত পুলিশ সদস্যদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করারও দাবি জানিয়েছে নেটওয়ার্কটি। একই সঙ্গে শিশু আইন, ২০১৩ এবং নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০ যথাযথভাবে প্রয়োগের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
শিশু সুরক্ষায় শুধু আইন থাকাই যথেষ্ট নয়—আইন প্রয়োগের প্রতিটি পর্যায়ে শিশুবান্ধব ও দ্রুত প্রতিক্রিয়াশীল ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন বলে মনে করছে সংগঠনটি।

নিরাপত্তা শুধু পরিবারের দায়িত্ব নয়
নেটওয়ার্কের বক্তব্য, শিশু কোথায় যাচ্ছে বা কার সঙ্গে যোগাযোগ করছে—এসব বিষয়ে পরিবারের সতর্কতা গুরুত্বপূর্ণ হলেও শিশুদের নিরাপত্তার পুরো দায়িত্ব পরিবারের ওপর চাপিয়ে দেওয়া যায় না। নিরাপদ রাস্তা, আলোকিত জনপরিসর, নজরদারি, দ্রুত পুলিশি সহায়তা এবং কার্যকর স্থানীয় সুরক্ষা ব্যবস্থা রাষ্ট্র ও সমাজেরও দায়িত্ব।

এ জন্য সরকার, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, স্থানীয় প্রশাসন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, পরিবার, গণমাধ্যম এবং নাগরিক সমাজকে সমন্বিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানানো হয়েছে। শিশুদের সহায়তার জন্য জাতীয় হেল্পলাইন ১০৯ এবং শিশু সহায়তা হেল্পলাইন ১০৯৮ সম্পর্কে জনসচেতনতা বাড়ানোর কথাও জানিয়েছে সংগঠনটি।

অপ্রতিমের মৃত্যু ঘিরে তদন্ত এগিয়ে চলার মধ্যে তার পরিবার ও সহপাঠীদের শোকের পাশাপাশি এখন সামনে এসেছে আরও বড় প্রশ্ন—একটি শিশু নিখোঁজ হওয়ার পর তাকে দ্রুত খুঁজে বের করা, সম্ভাব্য ঝুঁকি শনাক্ত করা এবং তাকে নিরাপদে ফিরিয়ে আনার জন্য দেশের বিদ্যমান ব্যবস্থাগুলো কতটা প্রস্তুত। শিশু অধিকার সংগঠনগুলোর দাবি, অপ্রতিম হত্যার বিচার নিশ্চিত করার পাশাপাশি এমন একটি কার্যকর সুরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যাতে কোনো শিশুর নিখোঁজ হওয়া কিংবা সহিংসতার শিকার হওয়ার ঘটনাকে আর স্বাভাবিক বা বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখা না হয়।