শুক্রবার, ৩ জুলাই, ২০২৬

জন্মের পরেই 'ডিজিটাল আইডি': বদলে যাচ্ছে বাংলাদেশের নাগরিক সেবা


বদলে যাচ্ছে দেশের নাগরিক সেবা পাওয়ার চেনা ছবি। ওয়ান সিটিজেন, ওয়ান ডিজিটাল আইডি’ উদ্যোগের আওতায় এবার জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত সব সরকারি সেবা মিলবে একটিমাত্র ডিজিটাল নম্বরে। বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে আইসিটি বিভাগের তৈরি করা এই মহাপরিকল্পনাটি বর্তমানে চূড়ান্ত অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।

২ জুলাই ২০২৬, ৯:১৬ অপরাহ্ণ 

জন্মের পরেই 'ডিজিটাল আইডি': বদলে যাচ্ছে বাংলাদেশের নাগরিক সেবা
  গুগল নিউজে ফলো করে আজকের প্রসঙ্গ এর সাথে থাকুন

বাংলাদেশে জন্ম নেওয়া প্রতিটি শিশুর জন্য জন্মের পরপরই একটি একক বা ‘ইউনিফায়েড ডিজিটাল আইডি’ নম্বর তৈরি করার পরিকল্পনা করছে সরকার। জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত একজন নাগরিকের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পাসপোর্ট ও ভূমি সেবাসহ সব ধরনের সরকারি তথ্য ও সেবা মিলবে এই একটি মাত্র আইডির অধীনে।

প্রধানমন্ত্রীর ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয় বিষয়ক উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদের ‘ওয়ান সিটিজেন, ওয়ান ডিজিটাল আইডি, ওয়ান ওয়ালেট’ ভাবনার ওপর ভিত্তি করে এই মহাপরিকল্পনা সাজানো হচ্ছে। কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এই উদ্যোগ সফল হলে নাগরিকদের বিভিন্ন দপ্তরে বারবার আলাদা পরিচয়পত্র ব্যবহার বা নতুন করে তথ্য দেওয়ার ভোগান্তি পোহাতে হবে না।

কী এই ‘ওয়ান সিটিজেন, ওয়ান ডিজিটাল আইডি’?

তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, প্রকল্পটি বর্তমানে ধারণাপত্র বা ‘কনসেপ্ট পেপার’ পর্যায়ে রয়েছে। এটি অনুমোদিত হলে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে চলমান ‘ডি-স্টার’ প্রকল্পের আওতায় এর মূল কাজ শুরু হবে। আগামী জুলাই মাস থেকেই এর প্রাথমিক প্রশাসনিক প্রক্রিয়া চালুর লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সরকার।

প্রকল্পের ধারণাপত্র কমিটির প্রধান ও আইসিটি বিভাগের যুগ্মসচিব মুজিবুর রহমান বিবিসি-কে (বাংলানিউজ) বলেন: "উদ্যোগটি এখন প্রাথমিক আলোচনা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর্যায়ে রয়েছে। জন্ম নিবন্ধন, এনআইডি, পাসপোর্ট, স্বাস্থ্য তথ্যসহ সব সেবা একটি সমন্বিত প্ল্যাটফর্মে আনার পরিকল্পনা রয়েছে আমাদের, যাতে নাগরিকরা এক আইডি-তেই সব সুবিধা পান।"

যেভাবে কাজ করবে এই ব্যবস্থা

সরকারি পরিকল্পনা অনুযায়ী, এই ডিজিটাল রূপান্তরটি সাজানো হয়েছে কয়েকটি ধাপে:

স্বয়ংক্রিয় আইডি সৃষ্টি: হাসপাতালে শিশু জন্ম নেওয়ার সাথে সাথেই সেই তথ্য চলে যাবে কেন্দ্রীয় জন্ম নিবন্ধন ব্যবস্থায়। মা-বাবার এনআইডির সাথে সমন্বয় করে তৈরি হবে নবজাতকের স্থায়ী ডিজিটাল আইডি। (বাসায় জন্ম নেওয়া শিশুদের জন্যও থাকবে বিকল্প ব্যবস্থা)।

এক প্ল্যাটফর্মে সব তথ্য: নির্বাচন কমিশন, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধন কর্তৃপক্ষের ডাটাবেজকে একসাথে যুক্ত করা হবে।

স্মার্টফোন ওয়ালেট: প্রত্যেক নাগরিকের জন্য থাকবে একটি ডিজিটাল আইডি ওয়ালেট। যেখানে এনআইডি বা পাসপোর্টের মতো নথিপত্র ডিজিটাল আকারে থাকবে। তবে এটি কোনো আর্থিক লেনদেনের ‘পেমেন্ট ওয়ালেট’ নয়, বরং পরিচয় যাচাইয়ের মাধ্যম হিসেবে কাজ করবে।

তথ্যের সুরক্ষা কতটুকু?

ডিজিটাল আইডি ব্যবস্থাপনায় বিশ্বে পথপ্রদর্শক ধরা হয় এস্তোনিয়া ও সিঙ্গাপুরকে। বাংলাদেশ সরকার মূলত এই দুই দেশের সফল মডেল পর্যালোচনা করেই নিজস্ব কাঠামো তৈরি করছে।

তবে সব তথ্য এক জায়গায় থাকলে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা বা ডেটা সুরক্ষার বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। এ বিষয়ে আশ্বস্ত করে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নাগরিকদের অনুমতি বা 'কনসেন্ট' ছাড়া কোনো তথ্য অন্য প্রতিষ্ঠানের সাথে শেয়ার করা হবে না।

প্রস্তাবিত 'ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষা আইন' ও 'জাতীয় ডেটা গভর্নেন্স' নীতি মেনেই এটি করা হবে। যেমন- কোথাও কেবল বয়স যাচাইয়ের প্রয়োজন হলে, নাগরিকের সম্মতিক্রমে শুধু বয়সটুকুই নিশ্চিত করা যাবে, পুরো প্রোফাইল দেখার সুযোগ থাকবে না।

সম্প্রতি এক বক্তব্যে তথ্যপ্রযুক্তি উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ জানান, কানেক্টিভিটি, ডিজিটাল পাবলিক ইনফ্রাস্ট্রাকচার (ডিপিআই), ডেটা সেন্টার ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই)- এই চার স্তম্ভের ওপর বিশেষ জোর দিচ্ছে সরকার। যার প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে আগামী মাস থেকেই দেশের প্রথম ডিপিআই কাঠামোর কাজ শুরু হতে যাচ্ছে।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা আশা করছেন, সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে আগামী আড়াই থেকে তিন বছরের মধ্যে এই ব্যবস্থার আনুষ্ঠানিক 'রোলআউট' বা মাঠপর্যায়ে ব্যবহার শুরু করা সম্ভব হবে। তবে এর চেয়েও দ্রুত কাজ শেষ করার চেষ্টা চলছে। এই প্রকল্প পুরোপুরি বাস্তবায়িত হলে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও নাগরিক হয়রানি অনেকাংশেই কমে আসবে বলে মনে করছেন নীতি-নির্ধারকেরা।