রবিবার, ৩০ আগস্ট, ২০২৬

নেপাল-চীন সীমান্তে ভয়াবহ বন্যা-ভূমিধস, প্রাণহানি বেড়ে ৫৮৪


নেপাল ও চীনের হিমালয় সীমান্তবর্তী এলাকায় ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসে প্রাণহানি বেড়ে ৫৮৪ জনে দাঁড়িয়েছে। একই সঙ্গে প্রায় আড়াই হাজার মানুষ এখনো নিখোঁজ রয়েছেন। উদ্ধারকাজ চললেও নতুন করে বন্যার আশঙ্কায় কিছু এলাকায় কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে হয়েছে।

২৯ আগস্ট ২০২৬, ১১:৪৯ পূর্বাহ্ণ 

নেপাল-চীন সীমান্তে ভয়াবহ বন্যা-ভূমিধস, প্রাণহানি বেড়ে ৫৮৪
  গুগল নিউজে ফলো করে আজকের প্রসঙ্গ এর সাথে থাকুন

নেপাল ও চীনের হিমালয় সীমান্তবর্তী এলাকায় ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসে প্রাণহানি বেড়েই চলেছে। স্থানীয় সময় শুক্রবার (২৮ আগস্ট) পর্যন্ত দুই দেশে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৫৮৪ জনে দাঁড়িয়েছে। একই সঙ্গে নিখোঁজ রয়েছেন প্রায় আড়াই হাজার মানুষ।

নেপালের পুলিশ জানিয়েছে, দেশটির উত্তরের বাগমতী প্রদেশে বুধবার (২৬ আগস্ট) শুরু হওয়া ভয়াবহ বন্যায় এখন পর্যন্ত ৫৭৯ জনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত হয়েছে। একই দুর্যোগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট তিব্বতের শিগাৎসে অঞ্চলের গিরং জেলায় ভূমিধসে চীনে আরও পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে। মাত্র এক দিনের ব্যবধানে নিহতের সংখ্যা ৩৬২ থেকে বেড়ে ৫৮৪ জনে দাঁড়িয়েছে। বন্যাকবলিত নেপালের বিভিন্ন এলাকায় উদ্ধারকাজের সময় একের পর এক মরদেহ উদ্ধারের পর প্রাণহানির সংখ্যা দ্রুত বেড়েছে।

নেপালেই নিখোঁজ মানুষের সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হয়ে ৯৭৭ থেকে বেড়ে ১ হাজার ৯২৪ জনে দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে তিব্বতে নিখোঁজ রয়েছেন আরও ৫৫৮ জন। সব মিলিয়ে দুই দেশে নিখোঁজ মানুষের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৪৮২ জনে।

নিখোঁজদের মধ্যে প্রায় ৩০টি দেশের ৫১৭ জন বিদেশি নাগরিক রয়েছেন। এ ছাড়া নেপালে একটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্প নির্মাণে কাজ করা দক্ষিণ কোরিয়ার নয় নাগরিকেরও এখন পর্যন্ত কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি।

ভয়াবহ এ দুর্যোগে উদ্ধারকাজে সহায়তার জন্য দক্ষিণ কোরিয়া, ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জাপান, শ্রীলঙ্কা ও বাংলাদেশ নেপালকে উদ্ধারকারী দল পাঠানোর প্রস্তাব দিয়েছে। তবে নেপালের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তারা বিদেশি আর্থিক সহায়তাকে স্বাগত জানালেও আপাতত বিদেশি উদ্ধারকারী দলের সহায়তা নিচ্ছে না।

নেপালের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র লোক বাহাদুর ছেত্রী বলেছেন, দেশটির নিরাপত্তা বাহিনী উদ্ধারকাজ পরিচালনা করছে এবং বর্তমানে বিদেশি উদ্ধারকারী দলের সহায়তার প্রয়োজন নেই। তবে প্রয়োজন হলে বিশেষায়িত সহায়তা বা দক্ষতার জন্য বিদেশি সহযোগিতা চাওয়া হবে। এদিকে নেপালের সবচেয়ে বড় জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের নির্মাণস্থলেও ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। প্রকল্পটির বন্যাকবলিত একটি সুড়ঙ্গে শতাধিক মানুষ আটকা পড়েছেন। তাদের উদ্ধারে কাজ করছে নেপালের সেনাবাহিনী।

কাদার পুরু স্তরে পুরো এলাকা ঢেকে যাওয়ায় সুড়ঙ্গের প্রবেশপথ খুঁজে পাওয়াও কঠিন হয়ে পড়েছে। প্রতিকূল আবহাওয়ার মধ্যেও এখন পর্যন্ত প্রায় ৩৫০ শ্রমিক ও স্থানীয় বাসিন্দাকে সুড়ঙ্গ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে নেপালের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়। ভেতরে আটকে থাকা আরও প্রায় ১০০ জনকে বের করে আনার চেষ্টা চলছে।

নেপালের উদ্ধারকারী কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, শুক্রবার বিকেল পর্যন্ত বন্যাকবলিত এলাকায় ১৪ হাজার ৮০০-এর বেশি নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েন করা হয়েছে। তারা এখন পর্যন্ত ৩ হাজার ৭৪২ জনকে উদ্ধার করেছেন, যাদের মধ্যে ১২১ জন বিদেশি নাগরিক।

এ ছাড়া হেলিকপ্টারের মাধ্যমে আরও ৩ হাজার ২৫৩ জনকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। তবে উদ্ধারকাজের মধ্যেই নতুন করে বিপদের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। পাহাড়ি এলাকায় ধ্বংসস্তূপ জমে তৈরি হওয়া একটি প্রাকৃতিক বাঁধের পেছনে পানি জমে যে হ্রদ তৈরি হয়েছিল, সেটি উপচে পড়েছে। এতে দ্বিতীয় দফায় ভয়াবহ বন্যার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এই পরিস্থিতিতে নেপাল ও চীনের কিছু এলাকায় উদ্ধারকাজ সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে হয়েছে।

আন্তর্জাতিক রেডক্রস ও রেড ক্রিসেন্ট ফেডারেশনের নেপাল প্রতিনিধি দলের প্রধান ডেভিড ফিশার জানিয়েছেন, এ দুর্যোগে অন্তত ৯৩ হাজার মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য দ্রুত মানবিক সহায়তা প্রয়োজন বলেও তিনি উল্লেখ করেছেন। পাশাপাশি নতুন করে বন্যার ঝুঁকি নিয়ে গুরুতর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন তিনি।

বিশ্লেষণ অনুযায়ী, লাংটাং লিরুং পর্বতের প্রায় ৫ হাজার ২০০ মিটার উচ্চতা থেকে প্রায় ৬০০ মিটার প্রশস্ত একটি হিমবাহ ও পাথরের বিশাল অংশ ভেঙে পড়েছিল। এর আঘাতের শক্তি প্রায় ৫ দশমিক ২ মাত্রার ভূমিকম্পের সমতুল্য ছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে। এরপর বরফ, পানি ও ধ্বংসাবশেষের বিশাল স্রোত লেন্দে নদী হয়ে প্রায় ৭০ কিলোমিটার দূরে ত্রিশূলী নদীর দিকে নেমে গিয়ে ভয়াবহ বন্যার সৃষ্টি করে। হিমবাহ গলে তৈরি হওয়া প্রাকৃতিক বাঁধের পেছনে জমে থাকা হ্রদের পানি হঠাৎ বেরিয়ে যাওয়ার ঘটনাও এই বিপর্যয়ের সঙ্গে জড়িত থাকতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তন ও বৈশ্বিক উষ্ণতা বাড়তে থাকলে ভবিষ্যতে হিমালয় অঞ্চলে এ ধরনের আকস্মিক বন্যা, ভূমিধস ও হিমবাহধসের ঘটনা আরও ঘন ঘন ঘটতে পারে বলে সতর্ক করেছেন বিশেষজ্ঞরা।

সূত্র: এনডিটিভি, দ্য হেরাল্ড বিজনেস, দ্য গার্ডিয়ান